আমেরিকা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আমেরিকা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ২ নভেম্বর, ২০২৪

ঝাল মরিচ

ঝাল মরিচ


 
আমাদের লিটু ভাই,
বড় সম্মানী, তাই
যা কিছু বলেন তিনি
চুপচাপ শুনে যাই।

কিন্তু আকস্মাৎ,
সেদিন সন্ধ্যারাত,
বিতর্ক শুরু হলো
খেতে খেতে ডাল ভাত। 

লিটু ভাই বলে, "শুন,
মরিচের শত গুণ।
খাবারের স্বাদ আসলে
ঝালে, আর লাল ঝোলে।"

তাঁর আজগুবি দাবি-
"ঝাল খেলে বল পাবি,
কচকচিয়ে চাবাবি,
পাতে নিয়ে ডলে খাবি,
আহা! হা হা! কাতরাবি,
তবেই না মজা পাবি!
করিস কী শঙ্কা?
কামড়া, নে লঙ্কা।"
দু মুঠো মরিচ দিয়ে,
বললেন আচমকা।



করলাম প্রতিবাদ,
“রাখো তুমি মিছে বাত”।
বললাম, "সব স্বাদ
ঝালে হয় বরবাদ।
রান্নায় দিলে ঝাল,
তুমি ভালো "কুক্" না।
ঝাল কোনো সুখ না!
বেশি বেশি ঝাল খেলে
জ্বলে কার বুক না?
সাদাসিধা খেয়ে লোকে
আরামে বাঁচুক না।"

কে শোনে হে কথা কার,
রেগে, দিয়ে চিৎকার,
বলে, "পাতে গোটা চার
মরিচ থাকুক না,
কাঁচা কি-বা শুঁকনা;
লাল লাল গুঁড়ো দিয়ে
মাছটা ভাজুক না।
লিখে রাখ মজা পাবি,
আমি মিথ্যুক না।"


ভাবি, আমি কে বলার
সে নেবে তার পাতে কী?
গ্যাস্ট্রিক, আলসার
বাঁধিয়ে বসুক না।
আমারই বা তাতে কী?

তর্ক এড়িয়ে যাই,
আর কথা না বাড়াই,
বিতর্ক করে যাব
কেন তাকে রাগাতে?

আমাদের ঝাল খাওয়ার
উৎসাহ জাগাতে,
সেই সাথে বীরবেশে
প্রশংসা বাগাতে,
তখুনি মরিচ নিয়ে
জিহবার আগা -তে,
কামড় বসিয়ে দিলো
বোম্বাই, নাগা -তে।

মিনিট দশেক পরে,
উঠে পেট চেপে ধরে,
ধাবিতো হলো সজোরে,
লিটু ভাই সাজঘরে।


তারিক মোঃ নাসিম
১১/০১/২০২৪ ইং

সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৪

ছোট্ট শহরের আড্ডা

ছোট্ট শহরের আড্ডা

অরেগন স্টেটের এই ছোট্ট শহর, থাকি সেথা সবে মিলে নাহি কেহ পর। হেথায় বসত করে দেশি কিছু ভাই, ইহাদের চাওয়া পাওয়া বেশি কিছু নাই। কেউ চলে সাদাসিধা, আলাভোলা মন, কারও বেশ উন্নত বসন-ভূষণ। বয়েসের ছাপ নাই কিছু চেহারায়, সেজেগুজে ইতিউতি ঘুরিয়া বেড়ায়, প্রতিবেলা পরনেতে নতুন কাপড়, কচি কচি চেহারার বুড়ো বুড়ো বর। অফুরান দম ভরা আছে ফুসফুসে। মনে হয় পা দিলো সে কেবল একুশে। প্রতিদিন আড্ডায় কতো কথা হয়, আড্ডার বিষয় তো ফুরাবার নয়। কারও বা “ধর্ম” প্রিয়, কারো “খেলা” প্রীতি, কারও শুধু ভালো লাগে “দেশ,রাজনীতি”। কেউ বেশ বাকপটু, চাপা জোড়দার, মানিতে চাহেনা কভূ বিতর্কে হার। কেউ বড় চুপচাপ শান্ত স্বভাব, কারও কবি-কবি ভাব, কবিতার অভাব। পাড়ার ধামড়া ছেলে মোরা ভাই ভাই, এক সাথে খেলি আর মসজিদে যাই, জামা’আতে নামাজ পড়ি, রোদ কি বারিষ, কাছে থাকি, তবু হয় দু’রাকাত মিস্‌। মসজিদ প্রাঙ্গণে ফোটে কতো ফুল, গন্ধ শুঁকতে গিয়ে টের পাই ভুল। মসজিদে দুই বেলা আড্ডার ছলে, উঠানেতে রাখি চোখ ডুমুরের ফলে। কেউ মোরা লিকলিকে, কেউ যেন হাতি, গাছে উঠে পেড়ে খাই ফল নাশপাতি। বিষ্যুদবারে রাতে ইফতার খাই, খেতে খেতে হেসে বলি, “রোজা রাখি নাই।” তারিক মোঃ নাসিম ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ইং

রবিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৩

গভীর রাতের আড্ডা

৫ টা বছর সময় এরিজোনার টেম্পি শহরে বসবাসের পর সেখান থেকে অরিগন এর পোর্টল্যান্ড এ মুভ করতে বেশ কষ্ট হয়েছে। মানসিকভাবে আমি সম্ভবত: এখনও পুরাপুরি মুভ করতে পারি নাই। মন পড়ে থাকে টেম্পি'র কাঠফাটা পিচগলা পথে, গ্যাস-ষ্টেশনে। কিছুদিন পরপর বিভিন্ন ছুতায় ফিরে ফিরে যাই অতি প্রিয় কিছু মানুষের টানে, প্রিয় টেম্পি শহরের টানে। পুরাতন মানুষজনের পাশাপাশি প্রতিবার পরিচয় হয় কিছু নতুন নতুন মানুষের সাথে, আর তাঁদের একেক জনের গুণের বহর দেখে আমি আশ্চর্য হই।

এমনই কোনো এক টেম্পি সফরে কোনো এক গভীর রাতের আড্ডায় দুইজন গুণী মানুষের সুপ্ত প্রতিভার পরিচয় পাই। সেবার টেম্পি থেকে ফেরার পথে বিমানে বসে তাঁদের স্মরণে লেখা এই কবিতা।


***


বিমান গগণে সবে মেলিয়াছে পাখা,

নিভায়েছে বাতি তার তুলিয়াছে চাকা,

বাঁধনে জড়ায়ে সিটে তশরীফ রাখা।


বাহিরে চাহিয়া দেখি টেম্পির হাতছানি,

স্মরণে আসিলো এক শায়ের, আল-"আহসানী",

তার সাথে কতিপয় কৌতুক "হাসানী"।


কাতুকুতু দিলো রস আদি, সর্বনাশী!

বদন কাঁপায়ে এলো বেদমক হাসি।

যতোই চাপিতে চাই,

ততোই বাড়িয়া যায়।

যাত্রীরা আঁড়চোখে দেখে ডানে বামে,

তথাপি সে হাসি মোর মোটে নাহি থামে।


হেনকালে এলো কাছে বিমানের বালা,

বালা নন, তিনি যেন জাদরেল খালা,

কষ্টে-সৃষ্টে দিনু হাসি-মুখে তালা।



মঙ্গলবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৩

হুড-টু-কোস্ট - ২০২৩

 ২০২২ এর জুলাই -এ ওরেগণ আসার পর যখন শুনলাম এইখানে একটা ইভেন্ট হয় যেখানে লোকজন মাউন্ট হুড থেকে একটানা দৌঁড়ে ~২০০ মাইল দূরে সাগর-পাড় পর্যন্ত যায়, তখন এইটাকে পাগলামি ছাড়া আর কিছুই মনে হয় নাই। আমার পাগল মন এই পাগলামি স্বচক্ষে অবলোকন করার এবং স্বশরীরে অনুভব করার লোভ সামলাতে পারলো না। এই কঠিন প্রোজেক্ট ‘পায়ে’ নেয়ার জন্য মন পুরোপুরি প্রস্তুত হলেও আমার দশাসই, বিশালবপু শরীরের প্রস্তুতিহীনতার বহর সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠছিল আমার XXL সাইজের ঢোলা-ঢালা গেঞ্জি ভেদ করে। মিকি’র মাধ্যমে পরিচয় হলো মাহফুজ এর সাথে। মাহফুজ ২০২২ এ এই দৌঁড় এ অংশগ্রহণ করেছে। Hood to Coast 2023 -এ অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে সে তার দল The Broken Bunch - এর জন্য লোক খুঁজছিল। আমি আগ্রহ প্রকাশ করায় সে আমাকে তাদের দল এ অন্তর্ভুক্ত করে ধীরে ধীরে প্রস্তুতি নেয়ার পরামর্শ দিল।

প্রায় ১০ মাস প্রস্তুতি নেয়ার পর শুক্রবার ২৫ আগস্ট ভোর আড়াইটায় শুরু হলো আমাদের দৌঁড়। মাউন্ট হুড এর টিম্বারলাইন লজ এর সামনে থেকে প্রতিটা দলের দৌঁড় শুরু হয়। একেক দল একেক সময় দৌঁড় শুরু করে। রেজিস্ট্রেশনের সময় দলের সবার গতি জানাতে হয়। দলের সদস্যদের গড় গতি’র উপর ভিত্তি করে HTC কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে সেই দল কখন শুরু করবে। স্বল্প-গতি’র দল আগে শুরু করে, দ্রুত-গতি’র দল পরে শুরু করে যাতে সবগুলা দল মোটামুটি একই সময়ে গন্তব্যে পৌঁছায়।

অন্যান্য রিলে দৌঁড় এর মতো এখানেও দলের একজনের দৌঁড় শেষ হওয়ার পর পরবর্তি জন দৌঁড়ায়। মোট ৩৬ টা ‘লেগ’ (Leg) এ ভাগ করা পুরাটা পথ। ৪-৮ মাইল এর মতো প্রতিটা লেগ এর দূরত্ব। একেকটার কাঠিন্য-স্তর একেক রকম। কোনোটা সহজ, কোনটা কঠিন। কিছু লেগ কঠিন দূরত্বের কারণে, কিছু কঠিন পাহাড়ি রাস্তার চড়াই উৎরাই এর কারণে। কিছু লেগ কঠিন দুপুরের গরম এর কারণে, কিছু লেগ কঠিন কারণ সেগুলায় পিচ-ঢালা পথের পরিবর্তে নুড়িপাথর বিছানো পথে দৌঁড়াতে হয়। দলের সদস্যদের দক্ষতা বিচার করে দলনেতা সিদ্ধান্ত নেয় কাকে কোন লেগ দৌঁড়ানোর দায়িত্ব দেয়া হবে।

সাধারণত ১২ জনের দল দুইটা Van -গাড়িতে ভাগ করা থাকে। Van 1 -এর ছয়জন প্রত্যেকে  একটি করে লেগ দৌঁড়ায়, তারপর অপেক্ষমাণ Van 2 দৌঁড় শুরু করে। Van 1 -তখন বিশ্রাম নেয় এবং অপেক্ষা করে Van 2 এর দৌঁড় শেষ হওয়ার জন্য। এইভাবে প্রতিটা ভ্যান এর সবাই ৩ বার করে দৌঁড়ায়।

Exchange Point 27 -এ অপেক্ষারত বিভিন্ন দল এর Van 1

Exchange Point 18 - এ The Broken Bunch দলের সদস্যরা


আমাদের দল এর সাকিব এবং দলনেতা ফুয়াদ ব্যাতিত বাকি সবাই প্রথমবারের মতো এই দৌঁড় এ অংশগ্রহণ করেছি। ফুয়াদ এবং  সাকিব ২০২২ এর HTC- শেষ হওয়ার পর (নামকরণের স্বার্থকতা প্রমাণ করে) ভেঙ্গে যাওয়া The Broken Bunch দলের অবশিষ্ট দুই সদস্য। মাহফুজ যদিও নিজে শেষ পর্যন্ত আর আমাদের সাথে দৌঁড় এ অংশ নিতে পারেনি, কিন্তু দলগঠনে এবং প্রস্তুতি নিতে সর্বাত্মক সাহায্য করেছে।

আমাদের দলের সদস্যদের বেশিরভাগই ওরেগণ এর বাহির থেকে এসেছে HTC-তে অংশগ্রহণ করার জন্য। দলনেতা ফুয়াদ-সহ আরও কয়েকজন এসেছে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্য থেকে, ওসমান মামুন এসেছে অস্টিন (টেক্সাস) থেকে, রেজা এসেছে ক্যালিফোর্নিয়ার বে’ এরিয়া থেকে। দৌঁড়ের পুরাটা সময় মূলত নিজের Van 1 এর সদস্যদের সাথেই বেশি সময় কাটানো হয়েছে আমার। আমিনুল জেম ছাড়া এদের কারো সাথেই আগে থেকে পরিচয় ছিল না, কিন্তু এই ইভেন্ট এর মাধ্যমে ভালো সখ্যতা তৈরি হয়েছে।

দলনেতা হিসাবে ফুয়াদ আমাদেরকে পুরা সময় যেইভাবে গাইড করেছে সেইটা প্রশংসনীয়। আমাদের দলের অধিকাংশেরই নিয়মিত দৌঁড়ানোর অভ্যাস নেই - এটা সে ভালোভাবেই জানে, তাই দ্রুত শেষ করার কোন তাড়া সে আমাদের দেয় নি। শুধু সুস্থভাবে শেষ পর্যন্ত গন্ত্যব্যে পৌঁছানোই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য - এটা সে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে।

Sea Side - এ The Broken Bunch দলের সদস্যরা

মাউন্ট হুড এর টিম্বারলাইন লজ থেকে ‘সি-সাইড’ এর সাগরপাড়ে পৌঁছাতে আমাদের দল এর সময় লেগেছে ৩৮ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট; ১১৬৪ -টি দল শেষ করতে পেরেছে পুরা দৌঁড়, তার মধ্যে আমাদের স্থান ১১৫৮ (শেষ দিক থেকে ষষ্ঠ হয়েছি আমরা)। তেমন গর্ব করার মতো কোন টাইমিং না, কিন্তু আমরা শেষ করতে পেরেই খুশি। দৌঁড় শেষে সি-সাইড এ পৌঁছে উৎসবমুখর পরিবেশ দেখে সবার ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। সেখানে গিয়ে জানলাম বাংলাদেশি বিশিষ্ট “বিজনেস-টাইকুন” মাসুদুর খান ভাই তাঁর সি-সাইড এর বেশ কয়েকটি বাড়ির একটি উন্মুক্ত করে দিয়েছেন HTC দৌঁড় শেষ করে আসা বাংলাদেশি দলগুলার বিশ্রাম নেয়ার জন্য। তাঁর আন্তরিক আতিথেয়তায় আমরা সবাই মুগ্ধ। দুইদিনের দৌঁড়ের পর ঘাম-চ্যাটচ্যাটে অবস্থায় মাসুদ ভাইয়ের বাসায় গরম পানিতে শাওয়ার নিয়ে আমাদের কেউ কেউ এটাকে জীবনের সেরা গোসল হিসাবেও আখ্যায়িত করলো।


এই দৌঁড় এ অংশগ্রহণ এর মাধ্যমে অনেকগুলো বিষয় শিখেছি।

১) অল্প হলেও নিয়মিত অনুশীলন অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমি গত দশ মাসে অনিয়মিতভাবে অনুশীলন করেছি, কোনো সপ্তাহে দুই তিনবার দৌঁড়ানোর পর পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ আর হয়তো দৌঁড়ানো হয় নি। এতে আমার পারফর্ম্যান্স এ আহামরি কোনো উন্নতি হয় নি। আগেও 5mph গতিতে দৌঁড়াইতাম, এখনও সেভাবেই দৌঁড়াই।

২) বাহ্যিক দৈহিক  আকৃতি দেখে মানুষের দক্ষতা বোঝা যায় না সবসময়। HTC -তে আমি 16.5 মাইল এর মত দৌঁড়েছি, একবারও অন্য কোনো দলের কোনো দৌড়বিদকে আমি অতিক্রম করতে পারি নাই, কিন্তু আমাকে অতিক্রম করে গিয়েছে শতশত মানুষ। অতিক্রম করে যাওয়ার সময় আমার সারা শরীরে ক্লান্তি এবং ধীর গতি লক্ষ্য করে অনেকেই “তুমিই পারবে”, “Keep it up”, “Way to go” ইত্যাদি উৎসাহমূলক কথা বলে যাচ্ছিল। এঁদের অনেককেই অন্যত্র দেখলে আমি হয়তো ধরে নিতাম সে আমার চেয়ে নিশ্চয়ই ধীরে দৌঁড়ায়।

৩) এই ধরণের ইভেন্ট এ রাস্তাঘাটে ভিড় হয় অনেক। যেইখানে দেড় ঘণ্টায় পৌঁছানো যাবে বলে মনে হয়, সেইখানে অন্তত দুই ঘণ্টা আগে রওয়ানা দেয়া উচিৎ। টয়লেট এর সামনেও অনেক ভিড় হতে পারে, এবং অনিয়মিত ঘুম এবং খাওয়া-দাওয়ার ফলশ্রুতিতে দৌঁড়ের ঠিক আগ-মুহূর্তে উত্তেজনায় “২ নাম্বার” চাপতে পারে। অতএব খাবার নিয়ে কোনো ধরণের এক্সপেরিমেন্ট করা যাবে না দৌঁড় এর দিন।

৪) নিজের সুস্থতার দিকে খেয়াল রাখা বেশি জরুরী। আবহাওয়া খারাপ হলে সেই অনুযায়ী গতি কমিয়ে, প্রয়োজনে বিশ্রাম নিয়ে নিজেকে সামলে নিতে হবে।

৫) দৌঁড়ানোর সময় “সিঙ্গারা” নয়, ‘বক্সার’ পরিধান করতে হবে।

৬) দৌঁড়ানোর সময় উপযুক্ত গেঞ্জি না পরলে পুরুষ মানুষের বক্ষাগ্র-দ্বয় এ ব্যাথা হইতে পারে, রক্তক্ষরণও হওয়া অসম্ভব নয়। HTC শুরুর আগের রাতে হোটেলে আমাদের একজন তার পূর্ব-অভিজ্ঞতা শেয়ার করার পর আমরা বাকিরা সবাই তাকে নিয়ে অনেকক্ষণ হাসাহাসি করলাম। পরেরদিন প্রচণ্ড গরমে দৌঁড় শেষ করে এসে আমাদের ষষ্ঠ দৌঁড়বিদ জানালো তার বক্ষাগ্র-দ্বয় জ্বালাপোড়া করছে।

আমাদের দলের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ। বিশেষ ধন্যবাদ Fuad Nur Taufique, শেষ পর্যন্ত ধৈর্য সহ আমাদেরকে গাইড করার জন্য। ধন্যবাদ Touhid Zaman এবং তার পরিবার-কে আমাদের দুই বেলার খাওয়াদাওয়ার ব্যাবস্থা করার জন্য। ধন্যবাদ স্বজন এবং তার স্ত্রী-কে, তাদের বাসা-টা আমাদেরকে নিজের বাসার মতো ব্যাবহার করতে দেয়ার জন্য। সেখানে গিয়ে ঘন্টা-দুইয়েক এর বিশ্রাম অনেক জরুরী ছিল। 

Ai Michael এবং Mahfuzur Rahman -কে ধন্যবাদ The Broken Bunch -এ যোগ দেয়ার ব্যাপারে সাহায্য করার জন্য।

ধন্যবাদান্তে

"ষষ্ঠ দৌঁড়বিদ"


Hood to Coast 2023 results

লেখাটি ফেসবুকে আমার এই পোস্ট -থেকে নেয়া।

শনিবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৩

ফোর পিক্‌স

মাঝরাতে দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়ার শব্দ শুনে চোখ ডলতে ডলতে দরজা খুলল ফজলে। দরজা খুলে দেখল তারিক দাঁড়িয়ে আছে, কাঁধে একটা ঝোলা-টাইপ ব্যাগ।

দরজা খুলতেই তারিক হড়বড় করে বলা শুরু করলোঃ "এই ফজলে, তোমারে এতবার কল দিতেছি, ফোন ধরো না কেন?" 

ফজলেঃ "ভাই, এখন তো রাত তিনটা বাজে... ।"

তারিকঃ "তিনটা বাজে তো কী হইছে? তোমার আর আমার না পাহাড়ে উঠার কথা, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে বের হও। ব্রাউন্স পীক-এ যাব। এইটা নাকি মারিকোপা কাউন্টি'র সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। সকাল সকাল রওয়ানা দিতে হবে, নাহয় রোদ উঠে গেলে ওঠা কঠিন হবে।"

ফজলে বললোঃ তারিক ভাই, আজকে না গেলে হয় না? ঘুমটা ঠিকমতো হয় নাই... ।

তারিক তার কথা শেষ করতে দিলো নাঃ "আরে মিয়া ঘুমাইতে তো পারবা সারাজীবনই, আজকে বন্ধের দিন, দেরি না করে বের হও।"

ফজলেঃ "আর কেউ যাবে ভাই? নাকি শুধু আমরা দুইজনই...?"

তারিকঃ "আর কেউ এখনও কনফার্ম করে নাই, তবে দেখি আরও দুই একজনকে ফোন দিব। কমল-কে অনলাইনে দেখাচ্ছে, কিন্তু কল দিচ্ছি রিসিভ করে না...। মনে হয় গার্লফ্রেন্ডের সাথে কথা বলতেছে।"

আরও কিছুক্ষণ গাঁই-গুই করে ফজলে শেষমেশ রাজি হয়ে রওয়ানা দিল।

... ... 

... ... 

এরপর পাহাড়ে উঠার শুরুর দৃশ্য, ট্রেইলের গোড়ায় পানি, ব্যাগ ইত্যাদি গুছিয়ে খুব আগ্রহের সাথে ফজলে-কে তাড়া দিয়ে আগে আগে হাঁটা শুরু করলো তারিক।

…

১৫-২০ মিনিট পরের দৃশ্য। ট্রেইলের পাশে গাছের নীচে পাথরের উপর পাছা ঠেকিয়ে বাঁকা হয়ে বসে আছে তারিক। জিহ্বা আধা-হাত বের হয়ে গেছে।সারা শরীর ঘামে ভিজা। মাথা বেয়ে দরদর করে ঘাম পড়ছে। 

পাশে দাঁড়িয়ে ফজলে বলছে, "ভাই, ট্রেইল তো মাত্র শুরু, আরও অনেক রাস্তা বাকি ... এখনই বসে পড়লেন যে... ?"

তারিক হাঁপাতে হাঁপাতে কোনোমতে বললঃ "আজকে রোদের কী মারাত্মক তেজ দেখছো? আরও ভোরে রওয়ানা দেয়া দরকার ছিল।...  ঘেমে শরীরের পানি সব বের হয়ে যাচ্ছে।... এইভাবে চললে কিছুক্ষণ পর শুকনা তেজপাতার মতো গাছের নিচে পড়ে থাকতে হবে।... তখন আমার এতো বড় বডি তো তুমি কাঁধে তুলে নামাইতে পারবা না। চলো আজকে ফিরে যাই। আরেকদিন ঠাণ্ডা আবহাওয়া দেখে আবার আসবো।" 

ফজলেঃ "কী বলেন ভাই? আপনিই তো মাঝরাতে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে আসলেন। এখন বলতেছেন ফিরে যাইতে? এক কাজ করেন, আপনি এইখানে বিশ্রাম করেন, আমি উপর থেকে ঘুরে আসি।"

তারিকঃ "না না, একা একা যাবা কেন? আমি অনলাইনে এই ট্রেইলের রিভিউ পড়েছি, সাপ-টাপ আছে, র‍্যাটেলস্নেক...। তাছাড়া দুই একজন নাকি ভাল্লুক-ও দেখেছে। একা যাইয়ো না। চলো আজকে ফিরে যাই।"

... 

আরও কিছুক্ষণ বাত-বিতন্ডা শেষে চরম বিরক্ত হয়ে ফিরতি পথ ধরলো ফজলে। 

(টেম্পি-রেচার নাটকের একটা দৃশ্য)

শুক্রবার, ১৭ মে, ২০১৯

মহাযাত্রা ১ - যুক্তরাষ্ট্রের সাত অঙ্গরাজ্য ভ্রমণ

সেমিস্টার শেষ হতে না হতেই মাথায় ঘুরতে লাগলো- একটু আশেপাশে ঘুরে আসা দরকার। এই ঘুরে বেড়ানোর চিন্তাটা এমন যে একবার মাথায় ঢুকলে আর বের হতে চায় না। শেষমেষ অবস্থা এমন দাঁড়ালো, পরীক্ষা’র পড়ালেখা বাদ দিয়ে আমি পরীক্ষা-পরবর্তী ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে লাগলাম অত্যন্ত মনযোগ দিয়ে। নিজেকে প্রবোধ দিলাম এই বলে যে পি এইচ ডি’র ছাত্রদের জন্য রেজাল্ট কোনো বিষয় না, কোনোমতে ন্যূনতম গ্রেড পেয়ে কোর্সগুলা পাশ করলেই চলবে (এ কথা সত্য কী না জানি না, কোনোদিন পি এইচ ডি শেষ করে চাকরির বাজারে গেলে হয়তো বুঝতে পারবো/ হাড়ে হাড়ে টের পাবো)।

ভ্রমণের পরিকল্পনা করাটা বেশ মজার একটা বিষয়। এটা আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন অক্লান্তভাবে করে যেতে পারি। পরিকল্পনা’র মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে গুগল ম্যাপে বিভিন্ন জায়গা খুঁজে খুঁজে এমন একটা পথ বের করা যেটা অনেকগুলা আকর্ষণীয় স্থান ছুঁয়ে যাবে আর এই পথে’র স্থানে স্থানে রাত্রিযাপনের জন্য স্বস্তায় হোটেল বা এয়ার-বি-এন-বি পাওয়া যাবে।

ভ্রমণের পরিকল্পনা শুরু করার ঘন্টাখানেক পরই খেয়াল করলাম, আমার ভ্রমণের পরিধি “আশেপাশে” থেকে ক্রমশ “দূরদূরান্তে” হারিয়ে যাচ্ছে। প্রথমে ভেবেছিলাম এরিজোনা’র সাথে কর্ণসম্পর্কে  আবদ্ধ অঙ্গরাজ্য কলোরাডো-তে গিয়ে ঘুরে ফিরে আসবো। পরে দেখলাম সেই পরিকল্পনা উত্তরোত্তর আরও উত্তরে ডালপালা মেলছে। শীঘ্রই লক্ষ্য করলাম উত্তরের অঙ্গরাজ্য ওয়াইয়োমিং ছাড়িয়ে উত্তরতর অঙ্গরাজ্য ‘মন্টানা’য় যাওয়ার জন্য আমার মনটা না কেমন যেন করছে। মন থেকে ’মন্টানা’  অনেক কষ্টে ঝেড়ে ফেলে আমেরিকা’র বিখ্যাত জাতীয় উদ্যান “ইয়েলোস্টোন” পর্যন্ত সীমানা নির্ধারণ করলাম, যেটা ওয়াইয়োমিং আর মন্টানা’র সীমান্তে অবস্থিত। ভ্রমণের উদ্দেশ্যও ঠিক করলাম - কোথাও গিয়ে বেশি সময় অবস্থান করবো না, ক্রমাগত ঘুরে ঘুরে শুধু আমেরিকা’র দু-চারটা অঙ্গরাজ্যের প্রাকৃতিক রূপ-বৈচিত্র একটু চোখ বুলিয়ে দেখবো। অবশ্য “আশপাশ” এর “দূরদূরান্ত” হয়ে যাওয়ার মতোই “দু-চারটা” পরবর্তিতে “দুইটা” এবং “চারটা” মিলে “ছয়টা” হয়ে গিয়েছিল।

প্রাথমিক দুশ্চিন্তা ছিল এতো দূরের রাস্তা একা গাড়ি চালিয়ে যাওয়া। ক্যালিফোর্নিয়া ট্যুরের শেষে নিদ্রাজনিত কারণে ঘটে যাওয়া এক বড়সড়(ক) দুর্ঘটনা’র রেশ এখনও যায় নাই আমাদের মন থেকে। তাই মূল সতর্কতা’র বিষয় ছিল আমি যেন গাড়ি চালাতে চালাতে ঘুমিয়ে না পড়ি।
আরেক দুশ্চিন্তা আমার ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মরিয়ম। তার এই অবস্থায় প্রথমে আমি একা ঘুরতে চলে যাওয়ার চিন্তা মাথায় আনাটাই আমার কান্ডজ্ঞানহীনতার প্রমাণ দেয়ার জন্য যথেষ্ঠ ছিল, কিন্তু আমার বেআক্কেল মন সেই প্রমাণে কোনো খুঁত রাখতে চাইলো না; আমার স্ত্রীকে, আমাদের সাড়ে পাঁচ বছরের ছেলে মুস’আবকে আর ‘নেগেটিভ’ তিন মাস বয়সী অনাগত সন্তানকে সঙ্গে নিয়েই বের হয়ে পড়লাম পৌনে তিন হাজার মাইলের লং-ড্রাইভ এ। ৭ দিনের ট্যুর এ ক্যালিফোর্নিয়া ব্যাতিত এরিজোনা’র বাকি প্রতিবেশী অঙ্গরাজ্য - নিউ মেক্সিকো, কলোরাডো, ইউটাহ এবং নেভাডা চষে ফেললাম, সেই সাথে সরাসরি প্রতিবেশী না এমন আরও দুইটা অঙ্গরাজ্য - ওয়াইয়োমিং আর আইডাহো।



আমাদের প্রথমদিনের সফর এরিজোনার টেম্পি শহর থেকে নিউ মেক্সিকো হয়ে কলোরাডো অঙ্গরাজ্যের কলোরাডো স্প্রিংস নামক শহরে যাওয়া। যাত্রা শুরু করে মূলতঃ পূর্ব দিকে প্রায় দশ ঘণ্টা ড্রাইভ করে পৌনে পাঁচশ মাইল পাড়ি দিয়ে চলে গেলাম নিউ মেক্সিকো’র রাজধানী শহর ‘সান্তা-ফে’-তে। এটা নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে পুরাতন রাজধানী-শহর। শহরের স্থাপনাগুলোর নকশায় এখনও এই পুরাতন-পুরাতন ভাবটা ধরে রাখা হয়েছে - ইচ্ছে করেই।
এই ভ্রমণে সান্তা ফে তে আমাদের রাত্রিযাপনের ইচ্ছা ছিল না, তাই ঘন্টাখানেক সেখানে অবস্থান করে সন্ধ্যা’র আগে  রওয়ানা দিলাম উত্তর দিকে কলোরাডো স্প্রিংস এর উদ্দেশ্যে। এরিজোনা আর নিউ মেক্সিকো’র আবহাওয়া এবং ভূমি’র চেহারা মোটামুটি কাছাকাছি, দুইটাই মরুভূমি। আশেপাশে বড়সড় গাছপালার দেখা পাওয়া শুরু করলাম সান্তা ফে থেকে উত্তর দিকে কলোরাডো’র উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়ার ঘন্টাদুয়েক পর। ততোক্ষণে অবশ্য আঁধার নেমে এসেছে। কলোরাডো স্প্রিংস-এ ইউ এস এয়ারফোর্স একাডেমির কাছে আমাদের হোটেলে পৌঁছাতে বেজে গেল রাত প্রায় এগারটা।
কলোরাডো স্প্রিংস এ ইকোনোলজ এ আমাদের দুই রাত থাকার কথা। হোটেলে পৌঁছেই মরিয়ম রাইস কুকারে নুডলস আর খিচুড়ি রান্না করে ফেললো অল্প সময়ের মধ্যেই। এইসব লং ট্যুরে সাথে একটা রাইস কুকার এবং চাল-ডাল-তেল সহ আনুষঙ্গিক মশলাপাতি নিয়ে আসলে বাইরে খাওয়ার ঝামেলা এড়ানো যায়। হোটেলের বদ্ধ রুমের ভিতর রান্না করলে দেশি মসলা সমৃদ্ধ রান্না’র কিছুটা গন্ধ রুমে থেকে যায়। সেটা রান্নার সময় হোটেলের এক পাশের জানালা খুলে রেখে আমরা কিছুটা কমিয়ে রাখতে পেরেছি।

দ্বিতীয়দিন সকাল সকাল উঠে হোটেল থেকে বের হয়েই কলোরাডো স্প্রিংস এর সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। গত রাতে দেরি হয়ে যাওয়ায় অন্ধকারে কিছু দেখতে পাইনি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬ হাজার ফিট উচ্চতার এই শহরের পূর্ব দিকে তাকালে দেখা যায় রকি মাউন্টেইনের পূর্ব পার্শ্বের বেশ কিছু পর্বতশৃঙ্গ। গ্রীষ্মের আগমণের প্রাক্বালে পর্বতগুলার বরফ সবে গলতে শুরু করেছে। চূড়াগুলো পুরোপুরি সাদা হলেও একটু নিচের দিকে সাদাকালো ডোরাকাটা নকশা করা পর্বতশৃঙ্গ-গুলা দেখলে শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে। আমরা পাইক্‌স পীক দেখার জন্য রওয়ানা দিলাম। পাইক্‌স পীক কলোরাডো’র সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। অবশ্য এর প্রবেশদ্বারে টোল আদায়ের অফিসে গিয়ে শুনলাম চূড়ায় ওঠার পথ আপাতত বন্ধ, বৈরি আবহাওয়ার কারণে। তবে যতদূর যাওয়া গেল তাতেই আমরা খুশি। গাড়ি চালিয়ে খুব দ্রুত অনেকটা উচ্চতায় উঠে যাওয়ায় শ্বাস-প্রশ্বাসে কিছুটা কষ্ট অনুভব করছিলাম। তাই কয়েকটা জায়গায় থেমে থেমে উঠলাম। পর্বত-টা মূলত বরফে ঢাকা থাকলেও বিভিন্ন স্থানে লাল মাটি এবং সবুজ ঘাস দেখা যায় বরফের ফাঁকে ফাঁকে।
সেদিন কলোরাডো শহরেই বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে হোটেলে ফিরে আসলাম।
তৃতীয়দিন সকালেই রওয়ানা দিলাম ওয়াইয়োমিং এর জ্যাকসন শহরের উদ্দেশ্যে। কলোরাডো স্প্রিংস থেকে ডেনভার হয়ে উত্তর দিকে ইন্টারস্টেট ২৫ (আই-২৫) হাইওয়ে ধরে এবং পরবর্তীতে আই-৮০ ধরে জ্যাকসন যাওয়া যায়, তবে আমরা বেছে নিলাম প্রথমে পূর্ব দিকে রকি মাউন্টেইনের পাশ দিয়ে যাওয়া আই ৭০, ইউ এস ৩৪ এবং ইউ এস ৪০ রুট। আগেই অনলাইনে বিভিন্ন পেইজে খোঁজাখুঁজি করে জেনেছি যে এই রাস্তায় গেলে কলোরাডো’র সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় সবচেয়ে বেশি, এবং সেটা সেদিন বুঝতে পেরেছি আমরা। কিছুটা তুষারপাত আর বৃষ্টি থাকলেও, আবহাওয়া বেশ আরামদায়ক ছিল। এই পথের বিভিন্ন স্থানে থেমে উপভোগ করলাম কলোরাডো’র স্নিগ্ধ সুন্দর প্রকৃতি। কলোরাডো নদী’র উৎসের কাছাকাছি গ্রেট লেক এবং লেক গ্র্যানবি দেখলাম, যদিও বরফে পানি অধিকাংশ জমে ছিল, তারপরও বেশ সুন্দর লেগেছে।

লেইক গ্র্যানবি থেকে আই-৪০ ধরে ক্রেমলিং এর দিকে যাওয়ার সময় কিছুক্ষণ পরপরই রাস্তার পাশে দেখা যাচ্ছিল কলোরাডো নদী। আমরা স্থানে স্থানে বিরতি নিয়ে এই নদী’র সৌন্দর্য দেখলাম। নদীর পাড়ে লাল-লাল গুল্মজাতীয় গাছ এবং আশেপাশে’র সবুজ ঘাস-সমৃদ্ধ তৃণভূমি অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর দৃশ্য তৈরি করেছে।আই-৪০ ধরে ক্রেইগ শহর পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে উত্তর দিকে কলোরাডো-১৩ রাস্তা ধরে ওয়াইয়োমিং এর বর্ডারের দিকে এগুলাম।

ওয়াইয়োমিং এর বর্ডারের শহর ব্যাগস্‌ এ পৌঁছাতেই সম্মুখীন হলাম ভারী তুষারপাতের। কিছুক্ষণ পর অবশ্য সেটা থেমে গিয়েছিল।

সেই রাস্তায় আমাদের গাড়ি ছাড়া উত্তর দিকে অন্য কোনো গাড়ি দেখিনি অনেকক্ষণ। দুইপাশে কোনো বাড়িঘরও নেই যতদূর চোখ যায়। আই-৮০ তে উঠে সন্ধ্যার কাছাকাছি সময়ে আমরা পৌঁছুলাম রক-স্প্রিংস নামক শহরে। পথে প্রতিটা বড় শহর দেখে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল আমার। তাই সেখানে একটা গীর্জার পার্কিং এ গাড়ি রেখে কিছুক্ষণ আশপাশটা দেখলাম। মাগরিবের নামাজ গীর্জা’র উঠানে পড়ে রওয়ানা দিলাম জ্যাকসন শহরের উদ্দেশ্যে।

ইউ এস - ১৯১ রাস্তা ধরে কিছুদূর এগুনোর পরই সন্ধ্যা নেমে এলো। দূরে পাহাড়ের আড়ালে সূর্য হারিয়ে গেলেও গোধুলি’র আলোর ছটা মিলিয়ে যেতে প্রায় ঘন্টাখানেক সময় লাগলো। এতক্ষণ আবহাওয়া বেশ ভালো ছিল। পাইনডেইল শহরে পৌঁছানো’র আগেই আবার শুরু হল তুষারপাত। আরও কিছুটা সামনে যেতেই সেটা তুষারঝড় -এ রূপান্তরিত হল। ততোক্ষণে রাত প্রায় সাড়ে নয়টার বেশি বেজে গিয়েছে। সমস্যা হচ্ছে, এইসব রাস্তায় রাত নয়টার পর বরফ পরিষ্কার করার গাড়ি আসে না। এই অবস্থায় এই তুষার-ঝড়ের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাওয়া বেশ বিপদজনক ছিল। তারপরও আর মাত্র ঘন্টাখানেক গাড়ি চালালেই হোটেলে পৌঁছাতে পারবো এই আশায় এগুতে লাগলাম। আরও কিছুদূর এগুনোর পর রাস্তা পুরোটা বরফে ঢেকে গেল। অন্ধকারে রাস্তা’র সীমানা বোঝা কঠিন হয়ে যাচ্ছিলো কোনো কোনো স্থানে। বীমার (উঁচু হেডলাইট) জ্বালিয়ে গাড়ি চালানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু বীমার দেয়ায় অতিরিক্ত আলো শুভ্র তুষার থেকে প্রতিফলিত হওয়ায় সামনে দেখতে আরও বেশি সমস্যা হচ্ছিল। আলো কমিয়ে আস্তে আস্তে এগুনোর চেষ্টা করালাম। কিছুক্ষণ যাওয়ার পর উল্টা দিক থেকে একটা গাড়ি এসে অতিক্রম করায় সেই গাড়ির চাকার দাগ দেখে দেখে রাস্তা ঠাহর করে এগুলাম বেশ কিছুদূর। এরপর পেলাম আমার সামনে একটা গাড়ি - একই দিকে যাচ্ছে। সেটার চাকার দাগ দেখে বাকি রাস্তা গেলাম। রাত এগারোটার দিকে হোটেলে পৌঁছে স্বস্তি’র নিঃশ্বাস ফেললাম।

রাতে ইয়েলোস্টোন যাওয়ার পথ খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম বরফজনিত প্রতিকূলতার কারণে এই সময় ইয়েলোস্টোন এ যাওয়ার সমস্ত পথ বন্ধ থাকে। তাই পরদিন জ্যাকসন শহরের কাছেই গ্র্যান্ড টিটন ন্যাশনাল পার্কে গেলাম। গ্র্যান্ড টিটন পাহাড়-লেক বনভূমি সমৃদ্ধ বেশ সুন্দর একটা ন্যাশনাল পার্ক। তবে আমরা যে সময় গিয়েছিলাম তখন লেকটা বরফে ঢাকা ছিল।

অল্পসময় সেখানে বেড়ানোর পড় দুপুরের আগেই রওয়ানা দিলাম আইডাহো’র উদ্দেশ্যে। গ্র্যান্ড টিটন হাইওয়ে ( ইউ এস ২২) এর পাহাড়ি রাস্তা ধরে ভিক্টর শহরের এর মধ্য দিয়ে ওয়াইয়োমিং থেকে আইডাহোর পথে এগুনোর সময় প্রথম দেখা হল সাপ নদী (Snake River) - এর সাথে। এই সাপ নদী পরবর্তী প্রায় দুইশত মাইল আমাদের পাশে পাশেই ছিল।

পাহাড়ি রাস্তা আইডাহো-৩১ থেকে সমতলে নেমে ইউ-এস ২৬ এ উঠার আগে গাড়ির তেল নেয়ার জন্য থামলাম সোয়ান ভ্যালীস্থ রেইনী-ক্রিক স্টোর-এ। গাড়িতে তেল নিয়ে এবং সেই দোকানের পৃথিবীবিখ্যাত বর্গাকৃতি’র আইসক্রিম খেয়ে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ আশেপাশের সবুজ প্রকৃতি দেখে আবার যাত্রা শুরু করলাম।

আইডাহোতে ঢুকার পরপরই ওয়াইয়োমিং এর বরফ-জমা সাদা প্রকৃতি সবুজ হয়ে গেল। সমতলভূমিতে আসার পর দেখলাম বিস্তৃত এলাকা জুড়ে খেতখামার। অনেক স্থানে এখনও চাষ শুরু হয়নি, জমি নিড়ানো চলছে বিশাল বিশাল ট্রাক-হো দিয়ে। কিছু কিছু স্থানে জমিতে পানি দেয়া হচ্ছে বিশাল বিশাল ওয়াটারিং হুইল দিয়ে।

আইডাহো ফলস্ নামক শহরে পৌঁছুলাম সন্ধ্যার আগে। রাজধানী-শহর ‘বয়জ’ এর পর আইডাহোর দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এটা। শহরের ঠিক কেন্দ্রেই বিশাল জলপ্রপাতটির অবস্থান। সেই সাপ নদীতে বাঁধ দিয়েই এটা বানানো হয়েছে। নদীর পাড় ঘেঁসে যাওয়া গ্রীনবেল্ট ট্রেইল এ কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে আমরা আবার রওয়ানা দিলাম আমাদের গন্তব্য টুইন ফলস শহরের উদ্দেশ্যে।

যাওয়ার পথে বিভিন্ন স্থানে থেমে সাপ নদী’র তীরে আরও কিছু সময় কাটালাম। বেশ খরস্রোতা এবং টলটলে স্বচ্ছ পানি। একদম হিমশীতল হওয়ায় পানিতে নামার উপায় ছিল না। কোনোমতে হাতমুখ ধোয়া যায় অল্প অল্প পানি হাতে নিয়ে।

টুইন ফলস-এ এয়ার-বি-এন-বি’র মাধ্যমে ভাড়া করেছিলাম একটা রুম। অল্পবয়সী এক দম্পতি তাদের বাড়ি’র দোতলার দুইটা ঘর ভারা দিচ্ছে - তার একটায় আমরা উঠলাম। খুব নির্জন এলাকা। কাঠের বাড়িতে হাঁটলে ক্যাঁচক্যাঁচ করে যে শব্দ হয় সেটা খুব কানে লাগে। অবশ্য রাতে ঘুম ভালোই হয়েছে আমাদের। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা বের হওয়ার সময় বুঝলাম সেই দম্পতি ইতিমধ্যে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেছে। আমরা আমাদের জিনিসপত্র সব নিয়ে একবারে বের হয়ে গেলাম। টুইন ফলস্‌ এর মূল আকর্ষণ সোশোন ফলস্‌ দেখতে গেলাম দুপুর নাগাদ। এতো বিশাল এবং শক্তিশালী জলপ্রপাত আর কখনো দেখিনি। পানির ঝাঁপটায় যে বাষ্প তৈরি হয়েছে তার মধ্যে বিশাল এক রঙধনু দেখা যাচ্ছিল। অনেকক্ষণ সেখানে অবস্থান করে এই অপরূপ দৃশ্য দেখলাম।


এরপর রওয়ানা দিলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্য সল্ট-লেক সিটি’র উদ্দেশ্যে।
ইন্টারস্টেট-৮৪ থেকে ইন্টারস্টেট-১৫ উঠার সময় থেকেই পূর্ব দিকে চোখে পড়লো বিশাল বিশাল পর্বতশ্রেণী। এই পর্বতশ্রেণী-গুলা পরবর্তীতে ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণ সীমান্তের কাছাকাছি পর্যন্ত আমাদের পাশে ছিল। সকালে তাড়াতাড়ি রওয়ানা হওয়ায় আমরা বিকাল নাগাদ পৌঁছে গেলাম সল্ট লেক এ।



সল্ট লেকের  কাছেই এন্টিলোপ আইল্যান্ড নামক এক দ্বীপে ঠুকলাম। আইল্যান্ড বলা হলেও, এটা পুরোপুরি দ্বীপ না। দক্ষিণ দিক মূল ভূখণ্ডের সাথে সংযুক্ত। এখানকার মূল আকর্ষণ লেক এবং পর্বতগুলার সুন্দর দৃশ্য এবং দ্বীপের ভিতর কিছু বন্য প্রাণী। লেকের মধ্য দিয়ে টানা প্রায় ছয় মাইল দীর্ঘ একটা রাস্তা দিয়ে দ্বীপে ঢুকতে হয়। আমরা কিছু বাইসন এবং হরিণ-সদৃশ এন্টিলোপ ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। এছাড়া অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছিল কোটি কোটি বিশাল আকৃতির মশা। ছয় মাইলের ওই রাস্তায় পঞ্চাশ মাইল বেগে গাড়ি চালানোর সময় হাজারখানেক মশা গাড়ির উইন্ডশিল্ডে ধাক্কা খেয়ে বেঘোরে মারা পড়ল। সেদিনই মূলত আমাদের সল্ট লেক দেখা শেষ। এখানে আর কোনো কিছু ঘুরে দেখার পরিকল্পনা ছিল না। তবে সেদিন রাতে হোটেলে যাওয়ার পর বসে বসে সল্ট লেক সিটি’র অন্যান্য আকর্ষণগুলা খুঁজে দেখছিলাম। শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত মর্মনদের ঐতিহাসিক গীর্জা টেম্পল স্কয়ার দেখার পরিকল্পনা করলাম।

সল্ট লেকের দক্ষিণ তীরে এই বাসাটাও এয়ার-বি-এন-বি’র মাধ্যমে ভাড়া করা। কেসলার পর্বতের একদম গোড়ায় এই বাসার বেইজমেন্টে বেশ কয়েকটা রুম সুন্দর করে সাজানো আছে। এর মধ্যে আমরা পেয়েছিলাম “বাচ্চাদের রুম” - যাতে তিনটা সিঙ্গেল বেড পেতে রাখা ছিল। এখানেও মরিয়ম আরেক দফা খিচুড়ি রান্না করে ফেললো। বাইরের খাবার আমাদের বেশিদিন পোষায় না। ডাল+ভাত খেতে মন চায়। আমার ছেলেও ঘরে রান্না খাবার ছাড়া তেমন কিছু খেতে চায় না।

আমাদের ভ্রমণ মূলত এখানেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। এখন ফিরতি পথে যা কিছু দেখব সেগুলা বোনাস। পথে সামান্য অতিরিক্ত কিছুটা রাস্তা পেরিয়ে ঘুরে এলাম ব্রাইস ক্যানিয়ন ন্যাশনাল পার্ক-এ। খুব বেশি সুন্দর মনে হয়নি আমার কাছে এই পার্ক।


ফিরতি পথ অনেক লম্বা হওয়ায় সরাসরি সল্ট লেক সীটই থেকে টেম্পিতে আমাদের বাসায় না এসে আমরা মাঝখানে একটা যাত্রা-বিরতি দিলাম জুয়া’র শহর লাস-ভেগাস এ। এখানে যাত্রা বিরতি নেয়ার মূল কারণ হোটেল ভাড়া কম। এছাড়া অন্য পথ দিয়ে (গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের পশ্চিম পাশ দিয়ে ঘুরে) যেতে যে সময় লাগতো, প্রায় একই সময় লাগে লাস ভেগাস হয়ে টেম্পি যেতে। পশ্চিম পাশটা আগে একবার ভালোভাবে ঘুরে দেখেছিলাম, তাই এইবার আর সেদিকে গেলাম না। লাস ভেগাস এ গিয়ে মূলত ঘুমালাম। অবশ্য আমার ছেলেকে নিয়ে এক ফাঁকে স্ট্রিপে একবার একটু ঢু মেরে এসেছি ঘন্টাদেড়েকের জন্য।

পরদিন লাস ভেগাস থেকে ফেরার পথে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন এ চলে গেলাম। এই সিদ্ধান্ত সেদিন সকালেই নিয়েছি। এই সফরে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু যেহেতু পুরো একটা দিন হাতে ছিল, সেটা দেখে আসাই উচিৎ বলে মনে হল। গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের বিশালত্ব এবং সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না, এমনকি ছবি তুলেও প্রকাশ করা সম্ভব না।
ফিরতি পথে ফ্ল্যাগস্ট্যাফে ছোট্ট একটা যাত্রা বিরতি নিয়ে রাত ১১ টার দিকে আমরা টেম্পিতে ফিরলাম।