স্কুলজীবন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
স্কুলজীবন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

হাতের লেখা

জানি না এখনকার স্কুলে বাচ্চাদের হাতের লেখার সৌন্দর্যের উপর কতোটা গুরুত্ব দেয়া হয়। কিন্তু সুন্দর হাতের লেখা / হাতের সুন্দর লেখা আমাদের সময় বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার ছিল। 

পরীক্ষায় শিক্ষকদের মন ভোলানোর একটা বড় হাতিয়ার ছিল ঝকঝকে পরিষ্কার হাতের লেখা।

ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত আমার হাতের লেখা ছিল আক্ষরিক অর্থেই "কাউয়ার ঠ্যাঙ, বগার ঠ্যাঙ"। ষষ্ঠ শ্রেণীতে হুমায়রা ম্যাডামের স্কেলের বাড়ি খেয়েছিলাম, খাতায় আমার বিচ্ছিরি লেখা ম্যাডাম পড়তে পারছিলেন না এই কারণে। এরপর সিদ্ধান্ত নিলাম হাতের লেখা ঠিক করতে হবে। ঠিক করলাম ক্লাসে যাদের হাতের লেখা সুন্দর তাদের লেখা নকল করবো। তখন থেকে মেট্রিক পাশ করা পর্যন্ত আমি সম্ভবত ৩০ থেকে ৪০ জনের হাতের লেখা নকল করার চেষ্টা করেছি। প্রথমে শুরু করেছিলাম আমার আব্বার হাতের লেখার মতো লিখতে, সেটা ওই বয়সে বেশ কঠিন মনে হলো, কারণ আব্বার হাতের লেখা ছিল টানা-টানা। এরপর ওবায়দুরের হাতের লেখার মতো লিখতে চেষ্টা করলাম, তারপর কিছুদিন পল্লব এর হাতের লেখা, তারপর ওসমান গণীর "ছাপা অক্ষরের" লেখা। আবদুল্লাহ আল আমিন (মাসুম) এর হাতের লেখাও সুন্দর ছিল, ওইটাও কিছুদিন চেষ্টা করলাম। ক্লাস সেভেন বা এইটে খেয়াল করলাম ফয়সাল বিন হাশেম এর হাতের লেখা অনেক সুন্দর, তৃপ্তি ম্যডাম সার্টিফাই করেছিলেন যে ক্লাসে সবচেয়ে সুন্দর লেখা ফয়সাল বিন হাশেম এর, তাই ওইটাও কিছুদিন চেষ্টা করলাম। নবম/ দশম শ্রেণীতে জাসেম আল লতিফ আর মইনুদ্দিন চিশতী'র হাতের লেখা নজর কাড়লো, দুইজনের লেখা অনেকটা একই রকম, ছোট ছোট হরফে লিখতো। সেটাও কিছুদিন চেষ্টা করলাম। আব্দুল্লাহ (বাচ্চু)র হাতের লেখা অবিকল ওসমান এর লেখার মতো ছিল। সেটাও আবার কিছুদিন ট্রাই করলাম।

এদের সবার হাতের লেখা এখনও আমার চোখের সামনে ভাসে। এতো বেশি চেষ্টা করেছি...।

এতো ঘনঘন হাতের লেখার ফরম্যাট বদলানোর ফলশ্রুতিতে আমার হাতের লেখা দেখতে আগের মতো দূর্বোধ্য আর রইলো না, কিন্তু গতি অনেক কমে গেলো। পরীক্ষায় আর ফুল আনসার করতে পারি না।

এস এস সি'র টেস্ট পরীক্ষার পর মাস দুইয়েক একটা নির্দিষ্ট হাতের লেখা স্থির করেছিলাম, সেই লেখায় উপরোক্ত অনেকের লেখার ছাপ ছিল। সেই ফরম্যাটেই মেট্রিক পরীক্ষা পর্যন্ত প্র‍্যাকটিস করে লেখার গতি কিছুটা বাড়ালাম। কিন্তু তারপরও সমাজে ফুল আনসার করতে পারলাম না। বাংলা দ্বিতীয় পত্রে টেনেটুনে শেষ করেছিলাম।

ইন্টারে উঠে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এলাম, আব্বার হাতের লেখা নকল করার ট্রাই করলাম আবার। এবার কিছুটা সফল হলাম, জেনেটিক্স কিছুটা সাহায্য করেছে সম্ভবত এইক্ষেত্রে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একটা ডায়েরিতে লিখতাম অনিয়মিতভাবে। সেটার একেক পাতায় একেক রকম হাতের লেখা ছিল। শুধু তাই না, ওই ডায়েরিতে আমার লেখা ছাড়াও আমার কয়েকজন ঘনিষ্ট বন্ধুর লেখাও ছিল, আবুহেনা, আলাল, বাচ্চু, (শানু?), আর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার হলের এক রুমমেট।  অনেক ঘটনাবহুল সময়ের স্মৃতিসম্বলিত সেই ডায়েরিটা হারিয়ে গিয়েছে।

শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১

"সামাজ"

সামাজিক বিজ্ঞান পড়াইতেন আবু সাইয়্যিদ স্যার, ক্লাসে অনেক বিষয় নিয়ে গল্প করতেন। মাঝে মধ্যে পড়া ধরতেন, না পারলে স্কেলের বাড়ি দিতেন হাতে।

স্যার গল্প করতে করতে ক্লাসের ৪০ মিনিট সময়ের মধ্যে ৩৫ মিনিটই পার করে দিতেন। একই গল্প অনেকবার করে শুনেছি আমরা। সম্রাট আকবর এর কাহিনী, তাঁর সভাসদ বীরবল-টোডরমল - এর কাহিনী এইসব দিয়ে শুরু হইতো। আকবর এর বিশেষ একেশ্বরবাদ এর কথা বলতেন স্যার প্রায়ই। আকবর নাকি প্রজাদের পরষ্পর দেখা হলে 'সালাম' দেয়ার বদলে 'আল্লাহু আকবর' বলার প্রথা চালু করতে চেয়েছিলেন (যাতে তার নাম উচ্চারণ হয়)।  বিভিন্ন দেশের মানুষের অভ্যাস, সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাসের ধরণ এইরকম অনেক বিষয় নিয়ে কথা বলতেন স্যার। আমাদের খাদ্যাভাসের বিবর্তন নিয়ে আলোচনা হইতো (আগে মানুষ "কচু"কে অবহেলা করতো, বলতো "কচু খাও", পরবর্তীতে দেখা গেল কচুতে আয়রন-ভিটামিন ... )।

অন্যান্য দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি, ধর্মীয় আচার ব্যাবহার এইসব নিয়েও আলোচনা হইতো। বলতেন আমরা উপমহাদেশের মানুষ ধর্মকর্ম করি শৈশবে, যৌবনে "মৌজ-মাস্তি" করি, আর বৃদ্ধ বয়েসে মরার ভয়ে আবার ধর্ম-কর্ম করি। তুরষ্কের মানুষের স্বভাব নাকি এর ঠিক উলটা। তাঁরা নাকি ধর্ম-কর্ম করে যৌবনে; বৃদ্ধ বয়সে নাকি আবার "ফূর্তি" মোড এ চলে যায় "কয়দিন আর বাঁচবো, একটু আনন্দ ফূর্তি করে নিই" এই চিন্তা করে। (এর প্রমাণ আমি কিছুটা পেয়েছি, এখানে এক তূর্কি ছেলের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছিল। সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগেই দুনিয়ায় যত রকমের নেশা-দ্রব্য রয়েছে সব অন্তত একবার ট্রাই করেছে। এখন সে মদ-গাঁজা তো দূরের কথা, বিড়িতেও কখনও একটা টান দেয় না। তবে একজন মানুষের উদাহরণ দিয়ে পুরা জাতি-কে বিচার করাও উচিৎ হবে না।)

আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়েও আলোচনা হতো। আফগানিস্তানকে কেন রাশিয়ার মতো মহাশক্তিও শায়েস্তা করতে পারছে না, ক্লিংটন-মনিকার প্রেমকাহিনী গুজব-নাকি-সত্যি এইজাতীয় অনেক মজার বিষয়।

যেদিন স্যার গল্প শুরু করতেন আমরা মনে মনে খুশি হইতাম, আজকে আর পড়া ধরবেন না স্যার।মাঝে মাঝে স্যারের ক্লাসে পিছনের দিকের বেঞ্চে বসতাম ইচ্ছা করেই। স্যার সামনে থেকে পড়া ধরা শুরু করলে পিছনে আসতে আসতে একবার টপিক-টা দেখে নিতাম। সমাজ মোটামুটি সহজই ছিল, গল্পের মতো। শুধু সন-তারিখ এইরকম কিছু নাম্বার একটু ভালোভাবে দেখে মুখস্থ করে নিতে হইতো, সেসময় তাৎক্ষণিক স্মরণশক্তি ভালো ছিল, কোন কিছু দেখে সাথে সাথে উগরে দিতে পারতাম, পরদিন আর সেটা মনে থাকতো না। এই অভ্যাস সম্ভবত গড়ে উঠেছে বছরের পর বছর শুধুমাত্র পরীক্ষার আগের রাতে পড়ে পরদিন পরীক্ষার খাতায় "সব-কিছু" লিখে দিয়ে আসার আপ্রাণ প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে।

ক্লাস সিক্স বা সেভেন এ সম্ভবত তৃপ্তি ম্যাডাম পড়াতেন সামাজিক বিজ্ঞান। আমরা এই বিষয়টাকে 'সমাজ' নামে ডাকলে তিনি রাগ করতেন, বলতে, এটা 'সমাজ' না, 'সামাজ'।  ম্যাডাম পড়ার বাইরে কোনো কিছু নিয়ে আলোচনা করতেন কি-না এখন আর মনে করতে পারছি না। করে থাকলেও হয়তো এতো মজাদার কিছু ছিল না সেগুলা। তবে ম্যাডাম ক্লাসে এসে ফ্যান বন্ধ করে জানালাগুলা সব খুলে দিতে বলতেন এইটা মনে আছে।

আমাদের ব্যাচ থেকে ২০০১ সালে সমাজে এস এস সি-তে এ+ পেয়েছে সম্ভবত মাত্র একজন (রেজাউল হায়াত)। আমাদের লিজেন্ড ছাত্র বেচারা ওসমান গণী-ও পায় নাই, যাকে তৃপ্তি ম্যাডাম একবার ১০০-তে ১০২ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

বাংলায় সম্ভবত পুরা স্কুল থেকে কেউ এ+ পায় নাই সেইবার, পাইলেও আমি জানি না, চট্টগ্রাম বোর্ডেই হাতে গোনা কয়েকজন পেয়েছিল।

গ্রেডিং সিস্টেমের প্রথম ব্যাচ, তাই সবাই সব বিষয়ে সমানভাবে গুরুত্বও দেয় নাই। আবার যেসব শিক্ষক খাতা কেটেছেন তাঁরাও সমাজ-বাংলার মতো বর্ণনামূলক বিষয়ে বেশি ছাত্রকে ৮০এর বেশি নাম্বার দেয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন না।

সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২১

তৃপ্তি ম্যাডামের ক্লাসে না-বলা কৌতুক

ক্লাস সেভেনের ঘটনা সম্ভবত।

বিকালে খেলার মাঠে এক বড় ভাই একটা দুষ্টু কৌতুক বলেছিলেন। তেমন ভালো মানের কৌতুক না। কিন্তু ওই সময় কেন যেন সেটা আমার বেশ ভালো লাগলো, এবং আমার ‘কচি’ মনে সেইটা গেঁথে গেলো বেশ ভালোভাবেই। জীবনে এর আগে যত কৌতুক শুনেছি সব কয়েকদিনের জন্য মুছে গেলো মেমোরি থেকে। সারাক্ষণই সেই একই  কৌতুক মাথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর আমি থেকে থেকে দমকে দমকে হেসে উঠছি একা একাই।

এদিকে সম্প্রতি কিছু কৌতুক বলে ক্লাসেও হালকা জনপ্রিয়তা পেয়েছি আমি। ক্লাসে আনন্দ-ফুর্তি’র কোনো উপলক্ষ্য এলেই প্রথম দুই-চার জনের মধ্যে আমার কৌতুক বলার প্রস্তাব আসতো (মাঝে মাঝে নিজেও আগ বাড়িয়ে কিছু বলতাম)। একদিন কোনো এক স্যার / ম্যাডাম এর অনুপস্থিতিতে রিপ্লেসমেন্ট ক্লাস নিতে এলেন তৃপ্তি ম্যাডাম। ম্যাডামের সেদিন মন বেশ ফুরফুরা। বললেন, আমরা আজকে কোনো পড়াশুনা করবো না। তোমাদের মধ্যে কেউ এসে গান গাও, বা গল্প বলো।

সেদিন আমার পাশে বসা কেউ একজন বলে উঠলো, ম্যাডাম নাসিম খুব ভালো কৌতুক বলে। ম্যাডাম আমাকে বললেন সামনে এসে কিছু একটা বলতে। আমার মাথায় তখনও আগেরদিনের শোনা সেই কৌতুক ঘুরছে, যেটা ক্লাসে বলার মতো না। আমি বললাম ম্যাডাম আজকে কিছু মনে আসছে না। কিন্তু ম্যাডাম জোরাজুরি করতে লাগলেন। ক্লাসে আরও কিছু পোলাপাইনও বলতে শুরু করলো, আরে যা, এতো ভাব নিচ্ছিস ক্যান। 

যাই হোক, অনেকক্ষণ ইতস্তত করার পর সামনে গেলাম। অলরেডি আমি ঘেমে গিয়েছি, পা-ও হালকা কাঁপছে। ম্যাডাম সাহস দিলেন, “বলো, এতো লজ্জা পাচ্ছ কেন?”

আমি আগেরদিন শোনা সেই কৌতুকটা বলা শুরু করলাম। প্রথম লাইন বলার সাথে সাথেই তৃপ্তি ম্যাডাম আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “আচ্ছা থাক … আর বলতে হবে না, গিয়ে বসো”।

প্রথম লাইন-টা ছিলঃ “এক লোক বাজার থেকে একটা আন্ডারওয়্যার কিনে আনলো … “।

সোমবার, ৪ জুন, ২০১৮

স্কুলজীবনের প্রিয় শিক্ষকদের কথা

আমাদের সবার প্রিয় শিক্ষক ছিলেন মহিউদ্দিন স্যার, ইসলাম শিক্ষা পড়াতেন। আমাদের স্কুলে পড়েছে, কিন্তু মহিউদ্দিন স্যারের বেতের/স্কেলের বাড়ি না খেয়ে স্কুল লাইফ পাড় করেছে এমন খুব কম ছাত্রই আছে। স্যারের নিয়মিত ডায়ালগ ছিল, "ওই-ত্তর গুরু" - এটা দিয়ে স্যার আসলে কী বুঝাতে চাইতেন আমি এখনও নিশ্চিত না, সম্ভবত "ওই গরু"। স্যারের ইসলাম শিক্ষা'র নোট পড়ে আমাদের ক্লাসের অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী এস এস সি পরীক্ষায় ইসলাম শিক্ষা বিষয়ে A+ পেয়েছিল।

নবম-দশম শ্রেণীতে সামাজিক বিজ্ঞান পড়াতেন আবু-সাইয়ীদ স্যার। মন মেজাজ একটু খারাপ থাকলে প্রথমে আগেরদিনের পড়া জিজ্ঞেস করতেন, সেক্ষেত্রে অধিকাংশ ছাত্রেরই দুইএকটা স্কেলের বাড়ি খেতে হত, অথবা শাস্তি-স্বরূপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হত। স্যার অনেক গল্প করতেন ক্লাসে। মোটামুটি মুঘল আমল থেকে শুরু করে তৎকালীন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী (ক্লিংটন-লিউনস্কি), ধর্ম, রাজনীতি, বাংলাদেশ, আমেরিকা, তুরস্ক, আফগানিস্তান কোনোকিছুই বাদ যেত না স্যারের একটা ক্লাসের আলোচনায়। শেষ ৫ মিনিটে স্যার বইয়ের এক দুইটা পাতা দ্রুত পড়ে যেতেন, আর বলতেন, এইটুকু বাসায় পড়ে আসতে। স্যারের খুব কমন ডায়ালগ ছিলঃ "এটাই হল বাস্তবতা"।
এছাড়া “পরীক্ষার টেনশনে পড়ালেখা হয় না” - এই কথাও স্যারের মুখেই প্রথম শুনেছিলাম।

কৃষিশিক্ষা'র শিক্ষক আবুল কাশেম স্যার খুব মজার মানুষ ছিলেন। যেহেতু স্কুলে একই নামে আরেকজন সিনিয়র শিক্ষক ছিলেন, সেহেতু, উনার নাম হয়ে গেল "কৃষি-কাশেম"। স্যারের ক্লাসে নকল করা খুব সহজ ছিল। আমি খুব বোকাসোকা ছাত্র ছিলাম, তাই নকল করতে পারতাম না (নকল করতেও বুদ্ধি লাগে)। জীবনে যে দুই একবার বড়মাত্রার নকল করেছি সেগুলা কৃষি-শিক্ষা'র 'ক্লাস-টেস্ট'-এ। স্যারের ডায়ালগ ছিলঃ "কান ছাই ধর”।

গণিত পড়াতেন আব্দুস সোবহান ফারুকী স্যার। স্যার আমাদের বইয়ের প্রায় সব অঙ্কই করে দিতেন ক্লাসে। আমাদের নিজেদের মাথা-খাটিয়ে করার আর বেশি কিছু বাকি থাকতো না। আমি গণিতে খুব দুর্বল ছিলাম, এবং স্যার এটা জানতেন। আমি যখন হঠাৎ কোন একটা অঙ্ক মিলিয়ে স্যারকে দেখাতাম, স্যার অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন। স্যার সবাইকে গণিত নিয়ে উচ্চতর পড়ালেখা করার বিষয়ে নিয়মিত সাবধান করতেন, বলতেনঃ “গণিতের সাগরে সাঁতার দিতে যেও না, পাড়িও দিতে পারবে না, ফিরেও আসতে পারবে না, হাবুডুবু খেয়ে মরতে হবে”।

প্রাইমারী স্কুলে পেয়েছিলাম প্রদীপ স্যারের ক্লাস। স্কুলজীবনে তাঁর মতো মেধাবী এবং মজার মানুষ আর কাউকে পাই নাই। স্যার আমাদের গণিত পড়াতেন ক্লাস ফাইভ-সিক্সে। কেউ দুষ্টামি করলে বা পড়া না পারলেই বলতেন, “মস্তিষ্ক গুঁড়ো করে দিবো”। মস্তিষ্ক, ভঙ্গুর জিনিস না, থলথলে একটা বস্তু, এটাকে কেন স্যার গুঁড়া করে দিবেন বলতেন জানি না। তবে স্যার কখনো কাউকে পিটাতেন না।

নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত (২০০১ SSC - ২০০৩ HSC ব্যাচ) তসলিমা আক্তার ম্যাডামের রসায়ন ক্লাস পেয়েছিলাম। অত্যন্ত যত্ন নিয়ে পড়িয়েছেন আমাদের। ম্যাডাম-কে নিয়ে একটা মজার স্মৃতি মনে পড়লো।আমি কলেজে উঠে স্কুলের চেয়ে আরো বেশ ফাঁকিবাজ হয়ে গেলাম। সেই-সাথে আলসেমি এবং কিপটামি করে বাংলা-ইংরেজি-ম্যাথ-কেমিস্ট্রি-ফিজিক্স এই সব বিষয়ের ক্লাস-নোট নেয়ার জন্য শুধুমাত্র দুই-টা লম্বা খাতা ব্যাবহার করতাম। ওই খাতাগুলায় খুবই ছোট-ছোট অক্ষরে লিখতাম যেন পুরা ইন্টারমিডিয়েট ওই খাতা দুইটা দিয়ে চালিয়ে দেয়া যায় (খুবই ছোটলোকি মানসিকতা -- এখন বুঝতেছি --- পড়াশুনার ব্যাপারে এতো কিপটামি না করলেও চলতো)। একদিন তসলিমা ম্যাডামের চোখে পড়লো আমার সেই মাইক্রোস্কোপিক লেখা। ম্যাডাম বললেনঃ "বাপের টাকাই যদি এতো কিপটামি করে খরচ করো, ভবিষ্যতে নিজের টাকা কীভাবে খরচ করবে?..."


(বি এ এফ শাহীন, চট্টগ্রাম)

-----------------------------------
ফেসবুকে এই  পোস্টে আমার কমেন্ট থেকে নেয়া।

শুক্রবার, ২ মার্চ, ২০১৮

শাহীনের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা


স্কুলে পড়ালেখায় ফাঁকি দেয়ার উপায় আমার কখনো ছিল না, কারণ 'পড়ালেখা' নামক সোনার হরিণ নিজেই সমস্ত স্কুলজীবন আমাকে ফাঁকি দিয়ে বেড়িয়েছে, কখনো ধরা দেয়নি। তাই আমার নিজ থেকে সে ব্যাপারে উদ্যোগী হয়ে তেমন কিছু করতে হয়নি। তবে প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখায় ফাঁকি দিতে না পারলেও, প্রাতিষ্ঠানিক খেলাধুলায় ফাঁকি দেয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট সাফল্যের দাবিদার আমি। অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে।

তখন সম্ভবত চতূর্থ বা পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ি। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চলছে তখন শাহীনে। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মৌসুম-টা বেশ আনন্দের ছিল। এমনিতেই উৎসবমুখর পরিবেশ, মেলা মেলা একটা ভাব।  খেলা হতো ষোল কোয়ার্টারের মাঠে। আমরা ছাত্রছাত্রী সবাই সকালবেলা স্কুল থেকে একে অপরের পিছনে সারিবদ্ধ হয়ে হেঁটে হেঁটে মাঠে যেতাম।
স্কুলের সবার সাথেই দেখা হচ্ছে, কিন্তু কোন পড়ালেখা করতে হচ্ছে না, এর চেয়ে আনন্দের আর কী আছে?

মাঠে যাওয়া’র ব্যাপারে আমার আগ্রহ যতোটা ছিল, খেলায় অংশগ্রহণের আগ্রহ ততোটা ছিল না। খেলাধুলায় তেমন পারদর্শী না হওয়াটা এর মূল কারণ না, মূল কারণ ছিল আশেপাশের কাঠবাদাম, বড়ই, আম, জাম, তেঁতুল, জলপাই এই সমস্ত ফলের গাছ। (আমি জীবনে প্রথম ‘পুতিজাম’ খেয়েছি সেই ষোল কোয়ার্টারে মাঠে যাওয়ার পথের এক গাছে) খেলার মৌসুমে এইসব গাছের অধিকাংশই ফলে ভর্তি থাকার ‘ফল’শ্রুতিতে আমাদের স্কুলের খাকি প্যান্টের পকেটও রঞ্জিত থাকতো বিভিন্ন ফলের রস এবং কষ -এ।
তাছাড়া শিক্ষকদের চোখ এড়িয়ে মাঠ থেকে পালিয়ে কিছুদূর গেলেই ভাঙ্গা বিমান এবং হেলিকপ্টারের একটা ‘জাংকইয়ার্ড’। সেখানে গিয়ে উড়োজাহাজের নষ্ট যন্ত্রপাতি কুরানোর চেয়ে আকর্ষণীয় কোন কাজ সেসময় মাথায় আসতো না।

একদিন মাঠে খেলাধুলা চলছে, আর ওদিকে আমি দৈনন্দিন অভ্যাসমতো খালপাড়ে পিঁপড়ার কামড় অগ্রাহ্য করে একটা কাঠবাদাম গাছের ডালে ঠ্যাং দুলিয়ে কাঠবাদাম চিবুচ্ছি। হঠাৎ স্কুলের স্টাফ ইদ্রিস ভাই গাছের গোড়ায় এসে আমাকে নিচে নামতে বললেন। নামার পর বললেন মাঠের অপর প্রান্তে কোন এক ম্যাডাম ডেকে পাঠিয়েছেন। আমার ভয়ে কলিজা শুকিয়ে গেল, আজকে না জানি কী আছে ‘পিঠে’। সারাবছর ক্লাসে শাস্তি পাই পড়ালেখা পারি না সে কারণে -  সেটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার, কিন্তু খেলার মাঠে এসেও শাস্তি পেলে সেটা তো ভীষণ লজ্জার ব্যাপার। 
সম্ভবত নাসরিন বানু ম্যাডাম এবং রওশন আরা ম্যাডাম ডেকেছিলেন। কাছে ডেকে কোনরকম বকাঝকা না করে বুঝিয়ে বললেন, গাছে চড়া বিপদজনক; আর যে ছেলের গাছে চড়ার পারদর্শিতা আছে সে চাইলে খেলাধুলায় ভালো করতে পারবে — এইরকম কিছু একটা। আমি খুবই অনুপ্রাণিত হলাম। খেলাধুলায় মনোযোগী হলাম। সে বছর সে মাঠে কোন পুরষ্কার ভাগ্যে না জুটলেও এক দুই বছর পর (ষষ্ঠ শ্রেণি-তে) ‘মাঠান্তরে’ (আর টি এস এর মাঠে) খেলাধুলায় কিছু পুরষ্কার পেয়েছিলাম। (সেটা অবশ্য নতুন মাঠের পাশে ফলের গাছের বদলে ঝাউ-গাছ থাকার কুফলও হতে পারে।)

ষষ্ঠ শ্রেনি’র সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে সপ্তম শ্রেণিতে আবার খেলাধুলায় নাম দিলাম। সেবার আমার একক প্রচেষ্টায় চার গুণিতক-১০০ মিটার রিলে দৌড় প্রতিযোগিতায় আমাদের দল দ্বিতীয় স্থান লাভ করে … বলাই বাহুল্য, প্রথম স্থান লাভ করার কথা ছিল … আমি সময়মত 'রিলে-ব্যাটন' আমাদের ফার্স্ট-বয় ওসমানের হাতে পৌঁছাতে পারিনি বিধায় দ্বিতীয়-স্থান জোটে।

সেটাই মূলত আমার সংক্ষিপ্ত 'খেলোয়ারজীবনের' পরিসমাপ্তি।

এই লেখা ফেসবুকের এই পোস্ট এর হুবহু অনুলিপি