ঘোরাফেরা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ঘোরাফেরা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৩

ফোর পিক্‌স

মাঝরাতে দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়ার শব্দ শুনে চোখ ডলতে ডলতে দরজা খুলল ফজলে। দরজা খুলে দেখল তারিক দাঁড়িয়ে আছে, কাঁধে একটা ঝোলা-টাইপ ব্যাগ।

দরজা খুলতেই তারিক হড়বড় করে বলা শুরু করলোঃ "এই ফজলে, তোমারে এতবার কল দিতেছি, ফোন ধরো না কেন?" 

ফজলেঃ "ভাই, এখন তো রাত তিনটা বাজে... ।"

তারিকঃ "তিনটা বাজে তো কী হইছে? তোমার আর আমার না পাহাড়ে উঠার কথা, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে বের হও। ব্রাউন্স পীক-এ যাব। এইটা নাকি মারিকোপা কাউন্টি'র সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। সকাল সকাল রওয়ানা দিতে হবে, নাহয় রোদ উঠে গেলে ওঠা কঠিন হবে।"

ফজলে বললোঃ তারিক ভাই, আজকে না গেলে হয় না? ঘুমটা ঠিকমতো হয় নাই... ।

তারিক তার কথা শেষ করতে দিলো নাঃ "আরে মিয়া ঘুমাইতে তো পারবা সারাজীবনই, আজকে বন্ধের দিন, দেরি না করে বের হও।"

ফজলেঃ "আর কেউ যাবে ভাই? নাকি শুধু আমরা দুইজনই...?"

তারিকঃ "আর কেউ এখনও কনফার্ম করে নাই, তবে দেখি আরও দুই একজনকে ফোন দিব। কমল-কে অনলাইনে দেখাচ্ছে, কিন্তু কল দিচ্ছি রিসিভ করে না...। মনে হয় গার্লফ্রেন্ডের সাথে কথা বলতেছে।"

আরও কিছুক্ষণ গাঁই-গুই করে ফজলে শেষমেশ রাজি হয়ে রওয়ানা দিল।

... ... 

... ... 

এরপর পাহাড়ে উঠার শুরুর দৃশ্য, ট্রেইলের গোড়ায় পানি, ব্যাগ ইত্যাদি গুছিয়ে খুব আগ্রহের সাথে ফজলে-কে তাড়া দিয়ে আগে আগে হাঁটা শুরু করলো তারিক।

…

১৫-২০ মিনিট পরের দৃশ্য। ট্রেইলের পাশে গাছের নীচে পাথরের উপর পাছা ঠেকিয়ে বাঁকা হয়ে বসে আছে তারিক। জিহ্বা আধা-হাত বের হয়ে গেছে।সারা শরীর ঘামে ভিজা। মাথা বেয়ে দরদর করে ঘাম পড়ছে। 

পাশে দাঁড়িয়ে ফজলে বলছে, "ভাই, ট্রেইল তো মাত্র শুরু, আরও অনেক রাস্তা বাকি ... এখনই বসে পড়লেন যে... ?"

তারিক হাঁপাতে হাঁপাতে কোনোমতে বললঃ "আজকে রোদের কী মারাত্মক তেজ দেখছো? আরও ভোরে রওয়ানা দেয়া দরকার ছিল।...  ঘেমে শরীরের পানি সব বের হয়ে যাচ্ছে।... এইভাবে চললে কিছুক্ষণ পর শুকনা তেজপাতার মতো গাছের নিচে পড়ে থাকতে হবে।... তখন আমার এতো বড় বডি তো তুমি কাঁধে তুলে নামাইতে পারবা না। চলো আজকে ফিরে যাই। আরেকদিন ঠাণ্ডা আবহাওয়া দেখে আবার আসবো।" 

ফজলেঃ "কী বলেন ভাই? আপনিই তো মাঝরাতে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে আসলেন। এখন বলতেছেন ফিরে যাইতে? এক কাজ করেন, আপনি এইখানে বিশ্রাম করেন, আমি উপর থেকে ঘুরে আসি।"

তারিকঃ "না না, একা একা যাবা কেন? আমি অনলাইনে এই ট্রেইলের রিভিউ পড়েছি, সাপ-টাপ আছে, র‍্যাটেলস্নেক...। তাছাড়া দুই একজন নাকি ভাল্লুক-ও দেখেছে। একা যাইয়ো না। চলো আজকে ফিরে যাই।"

... 

আরও কিছুক্ষণ বাত-বিতন্ডা শেষে চরম বিরক্ত হয়ে ফিরতি পথ ধরলো ফজলে। 

(টেম্পি-রেচার নাটকের একটা দৃশ্য)

শুক্রবার, ১৭ মে, ২০১৯

মহাযাত্রা ১ - যুক্তরাষ্ট্রের সাত অঙ্গরাজ্য ভ্রমণ

সেমিস্টার শেষ হতে না হতেই মাথায় ঘুরতে লাগলো- একটু আশেপাশে ঘুরে আসা দরকার। এই ঘুরে বেড়ানোর চিন্তাটা এমন যে একবার মাথায় ঢুকলে আর বের হতে চায় না। শেষমেষ অবস্থা এমন দাঁড়ালো, পরীক্ষা’র পড়ালেখা বাদ দিয়ে আমি পরীক্ষা-পরবর্তী ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে লাগলাম অত্যন্ত মনযোগ দিয়ে। নিজেকে প্রবোধ দিলাম এই বলে যে পি এইচ ডি’র ছাত্রদের জন্য রেজাল্ট কোনো বিষয় না, কোনোমতে ন্যূনতম গ্রেড পেয়ে কোর্সগুলা পাশ করলেই চলবে (এ কথা সত্য কী না জানি না, কোনোদিন পি এইচ ডি শেষ করে চাকরির বাজারে গেলে হয়তো বুঝতে পারবো/ হাড়ে হাড়ে টের পাবো)।

ভ্রমণের পরিকল্পনা করাটা বেশ মজার একটা বিষয়। এটা আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন অক্লান্তভাবে করে যেতে পারি। পরিকল্পনা’র মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে গুগল ম্যাপে বিভিন্ন জায়গা খুঁজে খুঁজে এমন একটা পথ বের করা যেটা অনেকগুলা আকর্ষণীয় স্থান ছুঁয়ে যাবে আর এই পথে’র স্থানে স্থানে রাত্রিযাপনের জন্য স্বস্তায় হোটেল বা এয়ার-বি-এন-বি পাওয়া যাবে।

ভ্রমণের পরিকল্পনা শুরু করার ঘন্টাখানেক পরই খেয়াল করলাম, আমার ভ্রমণের পরিধি “আশেপাশে” থেকে ক্রমশ “দূরদূরান্তে” হারিয়ে যাচ্ছে। প্রথমে ভেবেছিলাম এরিজোনা’র সাথে কর্ণসম্পর্কে  আবদ্ধ অঙ্গরাজ্য কলোরাডো-তে গিয়ে ঘুরে ফিরে আসবো। পরে দেখলাম সেই পরিকল্পনা উত্তরোত্তর আরও উত্তরে ডালপালা মেলছে। শীঘ্রই লক্ষ্য করলাম উত্তরের অঙ্গরাজ্য ওয়াইয়োমিং ছাড়িয়ে উত্তরতর অঙ্গরাজ্য ‘মন্টানা’য় যাওয়ার জন্য আমার মনটা না কেমন যেন করছে। মন থেকে ’মন্টানা’  অনেক কষ্টে ঝেড়ে ফেলে আমেরিকা’র বিখ্যাত জাতীয় উদ্যান “ইয়েলোস্টোন” পর্যন্ত সীমানা নির্ধারণ করলাম, যেটা ওয়াইয়োমিং আর মন্টানা’র সীমান্তে অবস্থিত। ভ্রমণের উদ্দেশ্যও ঠিক করলাম - কোথাও গিয়ে বেশি সময় অবস্থান করবো না, ক্রমাগত ঘুরে ঘুরে শুধু আমেরিকা’র দু-চারটা অঙ্গরাজ্যের প্রাকৃতিক রূপ-বৈচিত্র একটু চোখ বুলিয়ে দেখবো। অবশ্য “আশপাশ” এর “দূরদূরান্ত” হয়ে যাওয়ার মতোই “দু-চারটা” পরবর্তিতে “দুইটা” এবং “চারটা” মিলে “ছয়টা” হয়ে গিয়েছিল।

প্রাথমিক দুশ্চিন্তা ছিল এতো দূরের রাস্তা একা গাড়ি চালিয়ে যাওয়া। ক্যালিফোর্নিয়া ট্যুরের শেষে নিদ্রাজনিত কারণে ঘটে যাওয়া এক বড়সড়(ক) দুর্ঘটনা’র রেশ এখনও যায় নাই আমাদের মন থেকে। তাই মূল সতর্কতা’র বিষয় ছিল আমি যেন গাড়ি চালাতে চালাতে ঘুমিয়ে না পড়ি।
আরেক দুশ্চিন্তা আমার ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মরিয়ম। তার এই অবস্থায় প্রথমে আমি একা ঘুরতে চলে যাওয়ার চিন্তা মাথায় আনাটাই আমার কান্ডজ্ঞানহীনতার প্রমাণ দেয়ার জন্য যথেষ্ঠ ছিল, কিন্তু আমার বেআক্কেল মন সেই প্রমাণে কোনো খুঁত রাখতে চাইলো না; আমার স্ত্রীকে, আমাদের সাড়ে পাঁচ বছরের ছেলে মুস’আবকে আর ‘নেগেটিভ’ তিন মাস বয়সী অনাগত সন্তানকে সঙ্গে নিয়েই বের হয়ে পড়লাম পৌনে তিন হাজার মাইলের লং-ড্রাইভ এ। ৭ দিনের ট্যুর এ ক্যালিফোর্নিয়া ব্যাতিত এরিজোনা’র বাকি প্রতিবেশী অঙ্গরাজ্য - নিউ মেক্সিকো, কলোরাডো, ইউটাহ এবং নেভাডা চষে ফেললাম, সেই সাথে সরাসরি প্রতিবেশী না এমন আরও দুইটা অঙ্গরাজ্য - ওয়াইয়োমিং আর আইডাহো।



আমাদের প্রথমদিনের সফর এরিজোনার টেম্পি শহর থেকে নিউ মেক্সিকো হয়ে কলোরাডো অঙ্গরাজ্যের কলোরাডো স্প্রিংস নামক শহরে যাওয়া। যাত্রা শুরু করে মূলতঃ পূর্ব দিকে প্রায় দশ ঘণ্টা ড্রাইভ করে পৌনে পাঁচশ মাইল পাড়ি দিয়ে চলে গেলাম নিউ মেক্সিকো’র রাজধানী শহর ‘সান্তা-ফে’-তে। এটা নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে পুরাতন রাজধানী-শহর। শহরের স্থাপনাগুলোর নকশায় এখনও এই পুরাতন-পুরাতন ভাবটা ধরে রাখা হয়েছে - ইচ্ছে করেই।
এই ভ্রমণে সান্তা ফে তে আমাদের রাত্রিযাপনের ইচ্ছা ছিল না, তাই ঘন্টাখানেক সেখানে অবস্থান করে সন্ধ্যা’র আগে  রওয়ানা দিলাম উত্তর দিকে কলোরাডো স্প্রিংস এর উদ্দেশ্যে। এরিজোনা আর নিউ মেক্সিকো’র আবহাওয়া এবং ভূমি’র চেহারা মোটামুটি কাছাকাছি, দুইটাই মরুভূমি। আশেপাশে বড়সড় গাছপালার দেখা পাওয়া শুরু করলাম সান্তা ফে থেকে উত্তর দিকে কলোরাডো’র উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়ার ঘন্টাদুয়েক পর। ততোক্ষণে অবশ্য আঁধার নেমে এসেছে। কলোরাডো স্প্রিংস-এ ইউ এস এয়ারফোর্স একাডেমির কাছে আমাদের হোটেলে পৌঁছাতে বেজে গেল রাত প্রায় এগারটা।
কলোরাডো স্প্রিংস এ ইকোনোলজ এ আমাদের দুই রাত থাকার কথা। হোটেলে পৌঁছেই মরিয়ম রাইস কুকারে নুডলস আর খিচুড়ি রান্না করে ফেললো অল্প সময়ের মধ্যেই। এইসব লং ট্যুরে সাথে একটা রাইস কুকার এবং চাল-ডাল-তেল সহ আনুষঙ্গিক মশলাপাতি নিয়ে আসলে বাইরে খাওয়ার ঝামেলা এড়ানো যায়। হোটেলের বদ্ধ রুমের ভিতর রান্না করলে দেশি মসলা সমৃদ্ধ রান্না’র কিছুটা গন্ধ রুমে থেকে যায়। সেটা রান্নার সময় হোটেলের এক পাশের জানালা খুলে রেখে আমরা কিছুটা কমিয়ে রাখতে পেরেছি।

দ্বিতীয়দিন সকাল সকাল উঠে হোটেল থেকে বের হয়েই কলোরাডো স্প্রিংস এর সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। গত রাতে দেরি হয়ে যাওয়ায় অন্ধকারে কিছু দেখতে পাইনি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬ হাজার ফিট উচ্চতার এই শহরের পূর্ব দিকে তাকালে দেখা যায় রকি মাউন্টেইনের পূর্ব পার্শ্বের বেশ কিছু পর্বতশৃঙ্গ। গ্রীষ্মের আগমণের প্রাক্বালে পর্বতগুলার বরফ সবে গলতে শুরু করেছে। চূড়াগুলো পুরোপুরি সাদা হলেও একটু নিচের দিকে সাদাকালো ডোরাকাটা নকশা করা পর্বতশৃঙ্গ-গুলা দেখলে শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে। আমরা পাইক্‌স পীক দেখার জন্য রওয়ানা দিলাম। পাইক্‌স পীক কলোরাডো’র সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। অবশ্য এর প্রবেশদ্বারে টোল আদায়ের অফিসে গিয়ে শুনলাম চূড়ায় ওঠার পথ আপাতত বন্ধ, বৈরি আবহাওয়ার কারণে। তবে যতদূর যাওয়া গেল তাতেই আমরা খুশি। গাড়ি চালিয়ে খুব দ্রুত অনেকটা উচ্চতায় উঠে যাওয়ায় শ্বাস-প্রশ্বাসে কিছুটা কষ্ট অনুভব করছিলাম। তাই কয়েকটা জায়গায় থেমে থেমে উঠলাম। পর্বত-টা মূলত বরফে ঢাকা থাকলেও বিভিন্ন স্থানে লাল মাটি এবং সবুজ ঘাস দেখা যায় বরফের ফাঁকে ফাঁকে।
সেদিন কলোরাডো শহরেই বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে হোটেলে ফিরে আসলাম।
তৃতীয়দিন সকালেই রওয়ানা দিলাম ওয়াইয়োমিং এর জ্যাকসন শহরের উদ্দেশ্যে। কলোরাডো স্প্রিংস থেকে ডেনভার হয়ে উত্তর দিকে ইন্টারস্টেট ২৫ (আই-২৫) হাইওয়ে ধরে এবং পরবর্তীতে আই-৮০ ধরে জ্যাকসন যাওয়া যায়, তবে আমরা বেছে নিলাম প্রথমে পূর্ব দিকে রকি মাউন্টেইনের পাশ দিয়ে যাওয়া আই ৭০, ইউ এস ৩৪ এবং ইউ এস ৪০ রুট। আগেই অনলাইনে বিভিন্ন পেইজে খোঁজাখুঁজি করে জেনেছি যে এই রাস্তায় গেলে কলোরাডো’র সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় সবচেয়ে বেশি, এবং সেটা সেদিন বুঝতে পেরেছি আমরা। কিছুটা তুষারপাত আর বৃষ্টি থাকলেও, আবহাওয়া বেশ আরামদায়ক ছিল। এই পথের বিভিন্ন স্থানে থেমে উপভোগ করলাম কলোরাডো’র স্নিগ্ধ সুন্দর প্রকৃতি। কলোরাডো নদী’র উৎসের কাছাকাছি গ্রেট লেক এবং লেক গ্র্যানবি দেখলাম, যদিও বরফে পানি অধিকাংশ জমে ছিল, তারপরও বেশ সুন্দর লেগেছে।

লেইক গ্র্যানবি থেকে আই-৪০ ধরে ক্রেমলিং এর দিকে যাওয়ার সময় কিছুক্ষণ পরপরই রাস্তার পাশে দেখা যাচ্ছিল কলোরাডো নদী। আমরা স্থানে স্থানে বিরতি নিয়ে এই নদী’র সৌন্দর্য দেখলাম। নদীর পাড়ে লাল-লাল গুল্মজাতীয় গাছ এবং আশেপাশে’র সবুজ ঘাস-সমৃদ্ধ তৃণভূমি অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর দৃশ্য তৈরি করেছে।আই-৪০ ধরে ক্রেইগ শহর পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে উত্তর দিকে কলোরাডো-১৩ রাস্তা ধরে ওয়াইয়োমিং এর বর্ডারের দিকে এগুলাম।

ওয়াইয়োমিং এর বর্ডারের শহর ব্যাগস্‌ এ পৌঁছাতেই সম্মুখীন হলাম ভারী তুষারপাতের। কিছুক্ষণ পর অবশ্য সেটা থেমে গিয়েছিল।

সেই রাস্তায় আমাদের গাড়ি ছাড়া উত্তর দিকে অন্য কোনো গাড়ি দেখিনি অনেকক্ষণ। দুইপাশে কোনো বাড়িঘরও নেই যতদূর চোখ যায়। আই-৮০ তে উঠে সন্ধ্যার কাছাকাছি সময়ে আমরা পৌঁছুলাম রক-স্প্রিংস নামক শহরে। পথে প্রতিটা বড় শহর দেখে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল আমার। তাই সেখানে একটা গীর্জার পার্কিং এ গাড়ি রেখে কিছুক্ষণ আশপাশটা দেখলাম। মাগরিবের নামাজ গীর্জা’র উঠানে পড়ে রওয়ানা দিলাম জ্যাকসন শহরের উদ্দেশ্যে।

ইউ এস - ১৯১ রাস্তা ধরে কিছুদূর এগুনোর পরই সন্ধ্যা নেমে এলো। দূরে পাহাড়ের আড়ালে সূর্য হারিয়ে গেলেও গোধুলি’র আলোর ছটা মিলিয়ে যেতে প্রায় ঘন্টাখানেক সময় লাগলো। এতক্ষণ আবহাওয়া বেশ ভালো ছিল। পাইনডেইল শহরে পৌঁছানো’র আগেই আবার শুরু হল তুষারপাত। আরও কিছুটা সামনে যেতেই সেটা তুষারঝড় -এ রূপান্তরিত হল। ততোক্ষণে রাত প্রায় সাড়ে নয়টার বেশি বেজে গিয়েছে। সমস্যা হচ্ছে, এইসব রাস্তায় রাত নয়টার পর বরফ পরিষ্কার করার গাড়ি আসে না। এই অবস্থায় এই তুষার-ঝড়ের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাওয়া বেশ বিপদজনক ছিল। তারপরও আর মাত্র ঘন্টাখানেক গাড়ি চালালেই হোটেলে পৌঁছাতে পারবো এই আশায় এগুতে লাগলাম। আরও কিছুদূর এগুনোর পর রাস্তা পুরোটা বরফে ঢেকে গেল। অন্ধকারে রাস্তা’র সীমানা বোঝা কঠিন হয়ে যাচ্ছিলো কোনো কোনো স্থানে। বীমার (উঁচু হেডলাইট) জ্বালিয়ে গাড়ি চালানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু বীমার দেয়ায় অতিরিক্ত আলো শুভ্র তুষার থেকে প্রতিফলিত হওয়ায় সামনে দেখতে আরও বেশি সমস্যা হচ্ছিল। আলো কমিয়ে আস্তে আস্তে এগুনোর চেষ্টা করালাম। কিছুক্ষণ যাওয়ার পর উল্টা দিক থেকে একটা গাড়ি এসে অতিক্রম করায় সেই গাড়ির চাকার দাগ দেখে দেখে রাস্তা ঠাহর করে এগুলাম বেশ কিছুদূর। এরপর পেলাম আমার সামনে একটা গাড়ি - একই দিকে যাচ্ছে। সেটার চাকার দাগ দেখে বাকি রাস্তা গেলাম। রাত এগারোটার দিকে হোটেলে পৌঁছে স্বস্তি’র নিঃশ্বাস ফেললাম।

রাতে ইয়েলোস্টোন যাওয়ার পথ খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম বরফজনিত প্রতিকূলতার কারণে এই সময় ইয়েলোস্টোন এ যাওয়ার সমস্ত পথ বন্ধ থাকে। তাই পরদিন জ্যাকসন শহরের কাছেই গ্র্যান্ড টিটন ন্যাশনাল পার্কে গেলাম। গ্র্যান্ড টিটন পাহাড়-লেক বনভূমি সমৃদ্ধ বেশ সুন্দর একটা ন্যাশনাল পার্ক। তবে আমরা যে সময় গিয়েছিলাম তখন লেকটা বরফে ঢাকা ছিল।

অল্পসময় সেখানে বেড়ানোর পড় দুপুরের আগেই রওয়ানা দিলাম আইডাহো’র উদ্দেশ্যে। গ্র্যান্ড টিটন হাইওয়ে ( ইউ এস ২২) এর পাহাড়ি রাস্তা ধরে ভিক্টর শহরের এর মধ্য দিয়ে ওয়াইয়োমিং থেকে আইডাহোর পথে এগুনোর সময় প্রথম দেখা হল সাপ নদী (Snake River) - এর সাথে। এই সাপ নদী পরবর্তী প্রায় দুইশত মাইল আমাদের পাশে পাশেই ছিল।

পাহাড়ি রাস্তা আইডাহো-৩১ থেকে সমতলে নেমে ইউ-এস ২৬ এ উঠার আগে গাড়ির তেল নেয়ার জন্য থামলাম সোয়ান ভ্যালীস্থ রেইনী-ক্রিক স্টোর-এ। গাড়িতে তেল নিয়ে এবং সেই দোকানের পৃথিবীবিখ্যাত বর্গাকৃতি’র আইসক্রিম খেয়ে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ আশেপাশের সবুজ প্রকৃতি দেখে আবার যাত্রা শুরু করলাম।

আইডাহোতে ঢুকার পরপরই ওয়াইয়োমিং এর বরফ-জমা সাদা প্রকৃতি সবুজ হয়ে গেল। সমতলভূমিতে আসার পর দেখলাম বিস্তৃত এলাকা জুড়ে খেতখামার। অনেক স্থানে এখনও চাষ শুরু হয়নি, জমি নিড়ানো চলছে বিশাল বিশাল ট্রাক-হো দিয়ে। কিছু কিছু স্থানে জমিতে পানি দেয়া হচ্ছে বিশাল বিশাল ওয়াটারিং হুইল দিয়ে।

আইডাহো ফলস্ নামক শহরে পৌঁছুলাম সন্ধ্যার আগে। রাজধানী-শহর ‘বয়জ’ এর পর আইডাহোর দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এটা। শহরের ঠিক কেন্দ্রেই বিশাল জলপ্রপাতটির অবস্থান। সেই সাপ নদীতে বাঁধ দিয়েই এটা বানানো হয়েছে। নদীর পাড় ঘেঁসে যাওয়া গ্রীনবেল্ট ট্রেইল এ কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে আমরা আবার রওয়ানা দিলাম আমাদের গন্তব্য টুইন ফলস শহরের উদ্দেশ্যে।

যাওয়ার পথে বিভিন্ন স্থানে থেমে সাপ নদী’র তীরে আরও কিছু সময় কাটালাম। বেশ খরস্রোতা এবং টলটলে স্বচ্ছ পানি। একদম হিমশীতল হওয়ায় পানিতে নামার উপায় ছিল না। কোনোমতে হাতমুখ ধোয়া যায় অল্প অল্প পানি হাতে নিয়ে।

টুইন ফলস-এ এয়ার-বি-এন-বি’র মাধ্যমে ভাড়া করেছিলাম একটা রুম। অল্পবয়সী এক দম্পতি তাদের বাড়ি’র দোতলার দুইটা ঘর ভারা দিচ্ছে - তার একটায় আমরা উঠলাম। খুব নির্জন এলাকা। কাঠের বাড়িতে হাঁটলে ক্যাঁচক্যাঁচ করে যে শব্দ হয় সেটা খুব কানে লাগে। অবশ্য রাতে ঘুম ভালোই হয়েছে আমাদের। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা বের হওয়ার সময় বুঝলাম সেই দম্পতি ইতিমধ্যে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেছে। আমরা আমাদের জিনিসপত্র সব নিয়ে একবারে বের হয়ে গেলাম। টুইন ফলস্‌ এর মূল আকর্ষণ সোশোন ফলস্‌ দেখতে গেলাম দুপুর নাগাদ। এতো বিশাল এবং শক্তিশালী জলপ্রপাত আর কখনো দেখিনি। পানির ঝাঁপটায় যে বাষ্প তৈরি হয়েছে তার মধ্যে বিশাল এক রঙধনু দেখা যাচ্ছিল। অনেকক্ষণ সেখানে অবস্থান করে এই অপরূপ দৃশ্য দেখলাম।


এরপর রওয়ানা দিলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্য সল্ট-লেক সিটি’র উদ্দেশ্যে।
ইন্টারস্টেট-৮৪ থেকে ইন্টারস্টেট-১৫ উঠার সময় থেকেই পূর্ব দিকে চোখে পড়লো বিশাল বিশাল পর্বতশ্রেণী। এই পর্বতশ্রেণী-গুলা পরবর্তীতে ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণ সীমান্তের কাছাকাছি পর্যন্ত আমাদের পাশে ছিল। সকালে তাড়াতাড়ি রওয়ানা হওয়ায় আমরা বিকাল নাগাদ পৌঁছে গেলাম সল্ট লেক এ।



সল্ট লেকের  কাছেই এন্টিলোপ আইল্যান্ড নামক এক দ্বীপে ঠুকলাম। আইল্যান্ড বলা হলেও, এটা পুরোপুরি দ্বীপ না। দক্ষিণ দিক মূল ভূখণ্ডের সাথে সংযুক্ত। এখানকার মূল আকর্ষণ লেক এবং পর্বতগুলার সুন্দর দৃশ্য এবং দ্বীপের ভিতর কিছু বন্য প্রাণী। লেকের মধ্য দিয়ে টানা প্রায় ছয় মাইল দীর্ঘ একটা রাস্তা দিয়ে দ্বীপে ঢুকতে হয়। আমরা কিছু বাইসন এবং হরিণ-সদৃশ এন্টিলোপ ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। এছাড়া অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছিল কোটি কোটি বিশাল আকৃতির মশা। ছয় মাইলের ওই রাস্তায় পঞ্চাশ মাইল বেগে গাড়ি চালানোর সময় হাজারখানেক মশা গাড়ির উইন্ডশিল্ডে ধাক্কা খেয়ে বেঘোরে মারা পড়ল। সেদিনই মূলত আমাদের সল্ট লেক দেখা শেষ। এখানে আর কোনো কিছু ঘুরে দেখার পরিকল্পনা ছিল না। তবে সেদিন রাতে হোটেলে যাওয়ার পর বসে বসে সল্ট লেক সিটি’র অন্যান্য আকর্ষণগুলা খুঁজে দেখছিলাম। শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত মর্মনদের ঐতিহাসিক গীর্জা টেম্পল স্কয়ার দেখার পরিকল্পনা করলাম।

সল্ট লেকের দক্ষিণ তীরে এই বাসাটাও এয়ার-বি-এন-বি’র মাধ্যমে ভাড়া করা। কেসলার পর্বতের একদম গোড়ায় এই বাসার বেইজমেন্টে বেশ কয়েকটা রুম সুন্দর করে সাজানো আছে। এর মধ্যে আমরা পেয়েছিলাম “বাচ্চাদের রুম” - যাতে তিনটা সিঙ্গেল বেড পেতে রাখা ছিল। এখানেও মরিয়ম আরেক দফা খিচুড়ি রান্না করে ফেললো। বাইরের খাবার আমাদের বেশিদিন পোষায় না। ডাল+ভাত খেতে মন চায়। আমার ছেলেও ঘরে রান্না খাবার ছাড়া তেমন কিছু খেতে চায় না।

আমাদের ভ্রমণ মূলত এখানেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। এখন ফিরতি পথে যা কিছু দেখব সেগুলা বোনাস। পথে সামান্য অতিরিক্ত কিছুটা রাস্তা পেরিয়ে ঘুরে এলাম ব্রাইস ক্যানিয়ন ন্যাশনাল পার্ক-এ। খুব বেশি সুন্দর মনে হয়নি আমার কাছে এই পার্ক।


ফিরতি পথ অনেক লম্বা হওয়ায় সরাসরি সল্ট লেক সীটই থেকে টেম্পিতে আমাদের বাসায় না এসে আমরা মাঝখানে একটা যাত্রা-বিরতি দিলাম জুয়া’র শহর লাস-ভেগাস এ। এখানে যাত্রা বিরতি নেয়ার মূল কারণ হোটেল ভাড়া কম। এছাড়া অন্য পথ দিয়ে (গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের পশ্চিম পাশ দিয়ে ঘুরে) যেতে যে সময় লাগতো, প্রায় একই সময় লাগে লাস ভেগাস হয়ে টেম্পি যেতে। পশ্চিম পাশটা আগে একবার ভালোভাবে ঘুরে দেখেছিলাম, তাই এইবার আর সেদিকে গেলাম না। লাস ভেগাস এ গিয়ে মূলত ঘুমালাম। অবশ্য আমার ছেলেকে নিয়ে এক ফাঁকে স্ট্রিপে একবার একটু ঢু মেরে এসেছি ঘন্টাদেড়েকের জন্য।

পরদিন লাস ভেগাস থেকে ফেরার পথে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন এ চলে গেলাম। এই সিদ্ধান্ত সেদিন সকালেই নিয়েছি। এই সফরে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু যেহেতু পুরো একটা দিন হাতে ছিল, সেটা দেখে আসাই উচিৎ বলে মনে হল। গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের বিশালত্ব এবং সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না, এমনকি ছবি তুলেও প্রকাশ করা সম্ভব না।
ফিরতি পথে ফ্ল্যাগস্ট্যাফে ছোট্ট একটা যাত্রা বিরতি নিয়ে রাত ১১ টার দিকে আমরা টেম্পিতে ফিরলাম।

শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

স্যান ডিয়েগো সফর - ২০১৮

আমার জন্ম ২১-শে ফেব্রুয়ারি’র খুব কাছাকাছি বলেই কি-না জানি না, মাতৃভাষার ব্যাপারে আমি একটু বেশিই উৎসাহী। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ‘উদযাপন’-এর ব্যাপারে আমরা বাংলাদেশের মানুষ যতো আগ্রহী, অন্যান্য দেশের মানুষ ততো আগ্রহী না। তাদের কাছ থেকে আশা করাও যায় না … একে তো তারা ভাষার জন্য রক্ত দেয়নি, তার উপর এই ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা-দিবস’ ব্যাপারটা’র প্রচলন হয়েছে বেশিদিন হয়নি… অনেকেই এইটার ব্যাপারে জানে না। প্রশান্ত মহাসাগরের পাড়ে ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান-দিয়েগো শহরে চারদিনের একটা সফরে গিয়েছিলাম। সফরসঙ্গী হিসেবে বিভিন্ন দেশের ছাত্র ছিল। অনেক বলে কয়ে তাদের কয়েকজনকে শুধু “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” কথাটা তাদের নিজেদের ভাষায় বলাতে পেরেছি। তারা যারপরনাই বিরক্ত হয়েছে সেটাও বুঝতে পেরেছি। নিরাপত্তা-বিষয়ক গবেষনা’র উপর কঠিন কঠিন সব কথাবার্তা (Talk) শুনিয়ে আমাদের ‘কান’ পাকানো’র মহৎ উদ্দেশ্যে ল্যাব-এর প্রফেসর-রা এই বছর গুরু-‘গাধা’ নির্বিশেষে সব পি এইচ ডি ছাত্রদেরকে মূলত ‘কান-ধরে’ই টেনে নিয়ে গেলেন Network and Distributed System Security 2018 symposium -এ। প্রফেসরদের কড়া নির্দেশঃ শুধু কান পাকালেই চলবে না, কিছুটা ‘ঠোঁটকাটা’ হয়ে সেখানে আন্তর্জাতিক-মানের যতসব গবেষক আসবেন তাঁদের সাথে জ্ঞানগর্ভ কথাবার্তা বলার ভান করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উজ্জ্বল করার যথাসাধ্য চেষ্টাও করতে হবে। শীতে কিছুটা ঠোঁট ফাঁটলেও সত্যিকার অর্থে “ঠোঁটকাটা” হয়ে আগ-বাড়িয়ে কথাবার্তা বলা আমার জন্য বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তার উপর এতো সব বাঘা-বাঘা গবেষক, তাঁদের সাথে কী নিয়ে কথা বলবো সেটাই বুঝে পাই না। সিম্পোজিয়াম যে হল-রুমে হচ্ছে তার এক কোনায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি আমি আর নেপালি বন্ধু অনুষ (अनुस श्रेष्ठ)। সে-ও আমার মতো পি এইচ ডি প্রথম বর্ষের ছাত্র। স্থলাবদ্ধ দেশে বেড়ে উঠেছে সে, কখনো সাগর দেখেনি। স্যান ডিয়েগো এসে জীবনে প্রথমবার সাগরের ঢেউ দেখে আনন্দে আত্মহারা — তার উপর সেটা আবার প্রশান্ত মহাসাগর। প্রফেসরদের-দের নারাজ হওয়ার ভয়ে সারাদিন সিম্পোজিয়ামের বিরক্তিকর সব বক্তৃতা শুনলেও, তার মন সারাক্ষণ পড়ে থাকে সৈকতে। ফাঁকফোকর পেলেই দৌড়ে চলে যায় সাগর-পাড়ে, গিয়ে শিশুদের মতো ঝিনুক কুঁড়ায়, বালিতে নাম লিখে সেটার ছবি তুলে। তূর্কি বন্ধু ফারিস অবশ্য লোকজনের সাথে কথাবার্তা বলার ব্যাপারে বেশ সপ্রতিভ। সে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র, আমাদের ল্যাবের পুরাতন লোক। গবেষণার উপাত্ত সংগ্রহের কাজে এমনিতেই তার বড় বড় কোম্পানি’র হর্তাকর্তা লোকজনের সাথে কথা বলতে হয় নিয়মিত। তবে একটু ভালোভাবে খেয়াল করে দেখা গেল, সে সেখানকার নারী বক্তাদের সাথে কথা বলার ব্যাপারে তুলনামূলক কিছুটা বেশি উৎসাহী। সিম্পোজিয়ামের প্রথমদিন ক্রিপ্টোকারেন্সি’র উপর এক জার্মান সুন্দরী’র গবেষণার উপস্থাপনা দেখে, রাতে ক্রিপ্টোকারেন্সি’র উপর বিস্তর পড়ালেখা করা সত্ত্বেও পরের দিন সেই বক্তা’র সাথে কথা বলতে গিয়ে সে যারপরনাই নাজেহাল হয়েছে এমন খবর আমাদের ল্যাবের নিন্দুকেরা রটাচ্ছে। ঘটনা মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনা অবশ্য ক্ষীণ। নেপালি, তূর্কি আর এই অধম বাঙ্গালী ব্যাতিত বাকি ছাত্রছাত্রী ছিল ইরানি এবং চীনা। চীনা’রা আমাদের যথেষ্ট ‘চিনা’ হওয়া সত্ত্বেও কেন যেন নিজেদের একটা গ্রুপে একসাথে গল্পগুজবে নিমজ্জিত থাকে সবসময়। এটা শুধু সিম্পোজিয়ামে না, ক্যাম্পাসে- ক্লাসে, ল্যাবে সব জায়গায়। ইরানিরাও এর ব্যাতিক্রম না। আমরা বেশ কয়েকজন বাঙ্গালী একত্রে থাকলে আমরাও হয়তো নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতাম আমাদের আড্ডডাবাজি। আন্তর্জাতিক আড্ডাবাজি যে একদম হয় নাই তা না। আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে প্রাধান্য পায় ভাষার বৈচিত্র্য। এক ফাঁকে আমি প্রস্তাব দিলাম বিভিন্ন ভাষার কঠিন কঠিন ‘টাং টুইস্টার’ খেলার। খেয়াল করে দেখলাম, এই খেলায় বাংলাভাষী হিসেবে আমার সুবিধা অনেক বেশি। অন্যরা তাদের ভাষার যেসব ‘টাং টুইস্টার’ নিজেরাই বলতে হিমশিম খাচ্ছে, আমি অবলীলায় সেগুলা বলে যাচ্ছি। অবশেষে আমি আমার সাফল্যের গোপন রহস্য উন্মোচন করলাম - বাংলা বর্ণমালায় ৫০ টি বর্ণ। পৃথিবী’র অধিকাংশ ভাষার কঠিন কঠিন ধ্বনি-ই সম্ভবতঃ আমরা অল্পায়াসে রপ্ত করে ফেলতে পারবো। সিম্পোজিয়াম চলাকালে কথা যেটুকু বলেছি সেটা সেখানে দেখা হয়ে যাওয়া অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত দুইজন বাংলাদেশী তরুণ গবেষক ডঃ এনদাদুল হক ভাই এবং সৈয়দ রাফিউল -এর সাথে। এছাড়া আমার মতোই কোনায় দাঁড়িয়ে থাকা স্যামুয়েল নামের একটা ছেলের সাথে কয়েকবার কথাবার্তা হয়। কনফারেন্স শেষে award দেয়ার পর দেখা গেল, Distinguished Award পাওয়া প্রথম পেপার-টার লেখক যৌথভাবে সেই স্যামুয়েল এবং এনদাদ ভাই। মন-টা ভালো হয়ে গেল, বেছে বেছে যে দুই একজনের সাথে কথা বলেছি তাঁরাই সেরা এবং এর মধ্যে আমার দেশের লোকও আছে। অবশেষে ঠোঁটকাটা হতে না পারলেও, ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক, সিম্পোজিয়ামের জ্ঞানগর্ভ কথাবার্তা শুনে কান কিছুটা পেঁকেছে। আমার ল্যাবমেট নেপালি, তূর্কি, চীনা, ইরানি এবং আমেরিকান যেসব ছাত্রছাত্রী ছিল, আমার ‘লেইম-জোক’ শুনে তাদের অবশ্য কান পঁচে যাওয়ার মতো অবস্থা। বাংলা ভাষায় আমার খোঁড়া-কৌতুক ইতিমধ্যেই বাঙ্গালী-সমাজে সর্বজন-নিন্দিত। সেগুলা ইংরেজি-তে অনুবাদের পরেও এতোটা নিন্দা কুড়াবে সেটা আশাতীত ছিল। যাই হোক, শিক্ষা-সফর শেষে লাভ যেটা হলো, আমার মাতৃভাষার শক্তি আরেকটু ভালভাবে অনুধাবন করলাম। তাছাড়া জীবনে প্রথমবার প্রশান্ত-মহাসাগর দেখলাম; আমার ল্যাবমেট-দের অনেকের সাথেই সম্পর্ক বেশ সহজ হয়েছে - যেটা ভবিষ্যতে পি এইচ ডি’র দূর্গম পথ পাড়ি দেয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে আশা করা যায়।
[এই লেখা Facebook-এ প্রকাশিত আমার এই পোস্ট থেকে কপি পেস্ট করা।]

শুক্রবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

'আঁসু' ভেজা চোখে দেখা ভেজা ASU

বৃষ্টি-ভেজা ASU -- খুবই বিরল দৃশ্য। 
"arid zone" Arizona-তে বৃষ্টির দেখা পাওয়া যায় কালেভদ্রে।

বৃষ্টি দেখলে দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে মন চায়।
"ওগো, আজ তোরা যাসনে ঘরের বাইরে" -- কবিগুরুর সাথে আমার এইখানে কিছুটা মতানৈক্য।
(অবশ্য ছোটবেলায় স্কুলে যাওয়ার সময় বৃষ্টি নামলে কবিগুরুর এই বাণী অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করতাম ... হাজার হোক কবিগুরু তিনি, মাঝে মাঝে তো অন্তত গুরুর কথার গুরুত্ব দেয়া লাগে।)

গত পরশুদিন ঘুম থেকে উঠে বাইরে বৃষ্টি দেখে দ্রুত ঘর বের হয়ে গেলাম। সেদিন সারাদিনই বৃষ্টি হয়েছে, গুঁড়ি-গুঁড়ি; বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ সৃষ্টি হলে দেশে যেমন হয়। মেঘলা আকাশ, ভেজা রাস্তা, এইসব দেখে  বাংলাদেশের সমস্ত বাদল দিনের স্মৃতি একসাথে হানা দেয় মনে, চোখের কোনায় দুই এক ফোঁটা পানি জমে -- বৃষ্টির পানিই হবে হয়তো।

মনে পড়ে যায় ১০-১১ বছর আগে এক দিনের কথা। সেদিন SUST ক্যাম্পাসে প্রচণ্ড বৃষ্টিতে অনেকক্ষণ ভিজেছিলাম - সাথে ছিল "কবি-রাজ" Farhad। (কবি-রাজ খেতাবটা আমারই দেয়া অবশ্য)। এই ক্যাম্পাসে কবি-রাজ এর মতো সেইরকম ভাবের-ঘোরে আচ্ছন্ন ভবঘুরে সঙ্গী পাওয়া যায় না। এইখানকার মানুষ রোবটের মতো - এরা শখ করে বৃষ্টিতে ভিজে না, 'শর্ট-সার্কিট' হয়ে যাবে এই ভয়েই সম্ভবত। এইখানেও ক্যাম্পাসের আশেপাশে পাহাড়ের অভাব নাই, কিন্তু এই ক্যাম্পাসে কাওসার, Salak, Tareq নাই যাদেরকে নিয়ে ক্যাম্পাসের আশেপাশের সমস্ত পাহাড়ি এলাকা, রাস্তাঘাট যখন-তখন হেঁটে-হেঁটে চষে বেড়ানো যায়...।

'আঁসু' ভেজা চোখে ভেজা ASU দেখলাম বেশ কিছুক্ষণ ঘুরে ঘুরে। 
দেশের অভ্যাস মতো কিছুক্ষণ পরপর পিছন ফিরে দেখছিলাম প্যান্টের পিছন-টায় কাদা লাগলো কি-না -- দেখা গেল পরিষ্কারই আছে। এখানে বৃষ্টিভেজা রাস্তায় হাঁটা দেশের তুলনায় আরামদায়ক, প্যাঁক-কাদা নাই। রাস্তাঘাট একদম ঝকঝকে।

প্যাঁক-কাদাহীন, এমন মসৃণ রাস্তায় পথচলা এতো কষ্টকর হবে সেটা তো আগে বুঝতে পারি নাই।
[এই লেখা Facebook-এ প্রকাশিত আমার এই পোস্ট থেকে কপি পেস্ট করা।]

মঙ্গলবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০১৭

ফিনিক্স এর দক্ষিণ-পর্বত (South Mountain) ভ্রমণ

ডিসেম্বরের ১১ তারিখ সকাল সকাল সাইকেল আর এক বোতল পানি নিয়ে বের হয়ে গেলাম সাউথ মাউন্টেন এ যাওয়ার উদ্দেশ্যে। Apache & McClintock Drive থেকে Valley Metro'র একাশি নম্বর বাসে চড়ে প্রথমে গেলাম বেইজলাইন রোডে, তারপর সেখান থেকে ৭৭ নম্বর বাসে গেলাম সেন্ট্রাল এভিনিউ তে, তারপর '0' (zero) নম্বর বাসে চড়ে গেলাম সাউথ মাউন্টেইন এর কাছাকাছি।
যাওয়ার পথে একটা ঘোড়ার আস্তাবল চোখে পড়লো। জীবনে ঘোড়ার আস্তাবল আগে কখনো সামনাসামনি দেখি নাই।
আমি Holbert Trail দিয়ে উপরে উঠেছি। ট্রেইল-টা অনেক ঘুরানো পেঁচানো, খাঁড়া না। এইটাতে উঠা তুলনামূলক সহজ, ক্যামেলব্যাক এর তুলনায় তো বটেই, আমাদের সীতাকুণ্ডের চেয়ে-ও। সৌন্দর্যের দিক দিয়ে Camelback - এর উপরে, সীতাকুন্ডে'র ধারে কাছেও না। তবে উপরে হাইকিং এর ভালো জায়গা আছে, বেশ উপরে উঠা'র পর দেখি বিস্তৃত জায়গা প্রায় সমতল -- মালভূমি'র মতো।

গাড়ি নিয়ে একদম Dobbin's Lookout পর্যন্ত যাওয়ার ব্যাবস্থা-ও আছে; ভালো মানের সাইকেল থাকলে এবং "সাইক্লিং" এর অভ্যাস থাকলে সাইকেল চালিয়েও চূড়ায় উঠা যায়। তবে আমার-টার মতো স্বস্তা "পঞ্চাশ-টিক্কা, ছেকেন্ হ্যান্ড, পিছের চাক্কার ব্রেক ছাড়া" সাইকেল হলে নিচে গাছের সাথে তালা দিয়ে হেঁটেই উঠতে হবে।



Dobbin's -এ উঠার পর খেয়াল করলাম এইটা এইখানকার সবচেয়ে উঁচু শৃঙ্গ না, আশেপাশে আর বেশ কিছু উঁচু উঁচু পাহাড় আছে। বেশ কিছুক্ষণ সেখানে কাটিয়ে সেটা থেকে কিছুটা নিচে নেমে পার্শ্ববর্তী আরেকটা চূড়ায় উঠলাম। সেটা একদম পাথুরে।
একটা শৃঙ্গ থেকে আরেকটায় যাওয়ার পথে মালভূমি'র মতো জায়গাটায় খেয়াল করলাম বেশ বড়সড় শুকিয়ে যাওয়া স্রোতধারার (stream) দাগ রয়েছে। দেখলে বোঝা যায় এখান দিয়ে এককালে খরস্রোতা ঝর্ণাধারা বয়ে যেতো। Stream-গুলা বালি/নূড়িময় - ওগুলাতে হাঁটা কষ্ট। 
ফিরে আসার সময় সাইকেল নিয়ে যাওয়ার সুবিধা টের পেলাম। South Mountain-এর পাদদেশ থেকে Downtown Phoenix পর্যন্ত পুরা রাস্তাই ঢালু/উৎরাই ... ফলে, নামমাত্র প্যাডেল চেপেই প্রায় সাড়ে ছয় মাইল রাস্তা পার হয়েছি। 
তবে শুধু সামনের চাকার ব্রেক নিয়ে এই রাস্তায় সাইকেল চালানো-টা বেশ বিপদজনক।